বেসামাল কার্গো জাহাজের ধাক্কায় বাল্টিমোর সেতু ধসে পড়ার ঘটনায় এখনও তোলপাড় আমেরিকাসহ গোটা বিশ্ব। আমেরিকার মতো উন্নত দেশে এ ধরনের একটি দুর্ঘটনা কি করে ঘটলো, তা নিয়েই চর্চা এখন তুঙ্গে। সেই সঙ্গে সেতুটি পুনর্নির্মাণ করতে কতদিন সময় লাগতে পারে, তা নিয়েও চলছে হিসাব নিকাশ।
গেলো সোমবার স্থানীয় সময় রাত দেড়টায় যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর শহরের আইকনিক ‘ফ্রান্সিস স্কট কি’ সেতুর একটা বড় অংশ জাহাজের ধাক্কায় ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। এতে করে অচল হয়ে পড়ে দেশটির অন্যতম ব্যস্ত বাল্টিমোর বন্দর। বহির্নোঙ্গরে আটকা পড়ে যায় শত শত কার্গো জাহাজ।
সেতুটি বিধ্বস্ত হওয়ার একদিনেরও বেশি সময় পর ডুবুরিরা নিখোঁজ ছয় শ্রমিকের মধ্যে দুজনের দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে। পাটাপস্কো নদীর বরফের জলে ডুবে থাকা একটি লাল পিকআপ ট্রাকে দুই ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া গেছে। উদ্ধারকারীরা দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করে, একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মার্কিন পরিবহণ বিভাগ সেতুর ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতে এবং পুনর্নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করতে জরুরি সহায়তা হিসাবে ৬০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। সেতুটি সংস্কারে তহবিলে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে। এর আগে ২০০৭ সালে মিনেসোটায় সেতু ধসের সময় কংগ্রেস ২৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছিলো।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ কোম্পানি ইমপ্লানের মতে, প্রাথমিক অনুমানে সেতুটি পুনর্নির্মাণের ব্যয় ৬০০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। তবে ফেডারেল কর্মকর্তারা মেরিল্যান্ডের আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, সেতু পুনর্নির্মাণের চূড়ান্ত খরচ কমপক্ষে দুই বিলিয়ন ডলার হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, বাল্টিমোর সেতু ধসের ঘটনায় এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ সমুদ্র–বিমা পরিশোধের মুখোমুখি হতে পারে বিমা কোম্পানিগুলো। সেতু ধসের এই ঘটনায় বিমা কোম্পানিগুলোকে কয়েকশ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ গুনতে হবে। যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার মূল্য দাঁড়াতে পারে ৩০০ কোটি ডলার।

বিশেষজ্ঞরা জানান, কেবল সেতু ধসের জন্যই ১২০ কোটি ডলার গুনতে হবে বীমা কোম্পানিগুলোকে। আর নিহতদের জন্য কোম্পানিগুলোকে গুনতে হতে পারে ৩৫ কোটি থেকে ৭০ কোটি ডলার পর্যন্ত। বাণিজ্য ক্ষতির জন্যও বিমা কোম্পানিগুলোকে কোটি কোটি ডলারের আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে।
বাল্টিমোর সেতুর ধ্বংসাবশেষ অপসারণে ভাসমান তিনটি ভারী উত্তোলন ক্রেন নিযুক্ত করা হয়েছে। শুক্রবার বাল্টিমোর বন্দরে এসে পৌঁছেছে ক্রেনগুলো। মূলত ধসে পড়া সেতুটির জঞ্জাল সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্ঘটনার জায়গাটিকে পরিষ্কার করতেই এসব জায়ান্ট ক্রেনকে বাল্টিমোরে টেনে আনা হয়েছে।
এটিকে ‘উল্লেখযোগ্য জটিল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে মেরিল্যান্ডের গভর্নর বলেছেন, বিধ্বস্ত ব্রিজ থেকে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া গার্ডারগুলো কনটেইনার জাহাজে করে সরিয়ে নেয়া হবে। এটি কাছে থেকে দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন যে, এটি কতটা কঠিন কাজ।
হাজার হাজার টন ওজনের বাঁকানো পেঁচানো সেতুটি এখনও ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো জাহাজটিকে আটকে রেখেছে। সেটিকে সরাতে ভেঙে পরা সেতুর অংশগুলোকে উত্তোলন করা হবে। তারপর নদীর তল থেকে ইস্পাত এবং কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা হবে। এসব কাজের নকশাও চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

অন্যতম বৃহৎ বাল্টিমোর বন্দরের মাধ্যমে জাহাজ চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটছে। মেয়র জানিয়েছেন পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হবে। ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার না করা পর্যন্ত সেতুটি পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু করা যাবে না বলেও জানিয়েছেন মেয়র মুর।
ইউএস কোস্ট গার্ডের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শ্যানন গিলরেথ বলেছেন, ধসে পড়া সেতুটির যেসব অংশ এখনও ঝুলে আছে, সেগুলো নির্দিষ্ট মাপে কেটে সরাতে হবে। এর জন্য সঠিক পরিকল্পনা বের করতে কাজ চলছে। বর্তমানের তিনটি ক্রেনের সঙ্গে দ্রুত আরও একটি ক্রেন যুক্ত হবে।
বন্দরে এবং বন্দরের বাইরে একমুখী যান চলাচলের জন্য সেতু থেকে ধ্বংসাবশেষ সরানোই এখন মূল লক্ষ্য। তারপর নদীর তল থেকে ইস্পাত এবং কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা হবে। এতে কয়েক মাস সময় লাগবে। চ্যানেলটি সীমিত ট্র্যাফিকের জন্য এক মাসের কম সময়ের মধ্যে পুনরায় চালু করা যেতে পারে।
এদিকে যত দ্রুত সম্ভব সেতুটির প্রতিস্থাপনের জন্য একটি নকশা তৈরির কাজ চলছে। নতুন নকশায় সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হবে সর্বোচ্চ দুর্ঘটনার ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা রাখা। দেশটির নির্মাণ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন নকশায় সেতুটি পুনর্নিমাণে কমপক্ষে দশ থেকে ১২ বছর সময় লাগতে পারে।
পবিত্র ভূমি দিবসে ফিলিস্তিনিদের প্রতিবাদ যাত্রা
বাল্টিমোর দুর্ঘটনার কার্টুন চিত্রে তোলপাড় নেটদুনিয়া