সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুয়েইদা প্রদেশে দ্রুজ যোদ্ধা ও সুন্নি বেদুইন উপজাতিদের মাঝে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৯৪০ জনে পৌঁছেছে। শনিবার (১৯ জুলাই) যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস এই তথ্য জানিয়েছে।
যদিও এই সাম্প্রদায়িক সংঘাতের অবসানে সুয়েইদায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে সিরিয়ার সরকার। এখন সুয়েইদা থেকে বেদুইন যোদ্ধাদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।
সিরিয়ার দ্রুজপ্রধান শহর সুয়েইদা থেকে বেদুইন যোদ্ধাদের সরিয়ে দিয়েছে দেশটির সরকার। সিরিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শহরের মহল্লাগুলোতে সংঘর্ষ বন্ধ করা হয়েছে।
শনিবার সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার নির্দেশ দেয়ার পর অঞ্চলটি থেকে নিরাপত্তা বাহিনীকে সরিয়ে দেয়া হয়।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি আলাদা চুক্তি হয়। এ চুক্তির উদ্দেশ্য ছিলো সংঘর্ষে ইসরাইলের সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানো। সিরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ সংঘর্ষে অন্তত ২৬০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৭০০ জন। তবে অন্যান্য সূত্র বলছে, হতাহতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে গেছে।
সংঘাতের জেরে ৮৭ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গত সপ্তাহ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় সুওয়েইদা প্রদেশে সংখ্যালঘু দ্রুজ সম্প্রদায় সশস্ত্র বেদুইনদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। দ্রুজ যোদ্ধারা সুওয়েইদা শহর থেকে বেদুইন অস্ত্রধারীদের তাড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে, তবে প্রদেশের অন্যান্য অংশে লড়াই অব্যাহত আছে।
এদিকে, সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমাদ আল-শারাকে বিশ্বাস করেন না বলে মন্তব্য করেছেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে তিনি তিনি অভিযোগ করেন, সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট শারা ‘জিহাদিবাদী গোষ্ঠী’গুলোকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন এবং ভবিষ্যতে সেগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে পারেন।
এদিকে, সিরিয়ার দ্রুজ সম্প্রদায়ের সমর্থনে ইসরাইল অধিকৃত গোলান মালভূমিতে বিক্ষোভ করেছেন সেখানে বসবাসকারী দ্রুজ গোষ্ঠীর সদস্যরা। শনিবার সিরিয়া ইসরাইল সীমান্তে জড়ো হয়ে তারা এ প্রতিবাদ জানায়। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আঞ্চলিক সংঘাতের মুখে সিরিয়া থেকে বহু বাসিন্দা সীমান্ত পার হয়ে ইসরাইলে প্রবেশ করছে। এ অবস্থায় সীমান্তে প্রাচীর দেয়াসহ যাবতীয় নিরাপত্তা জোরদার করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ।
এর আগে, গত সপ্তাহে একটি মহাসড়কে এক দ্রুজ ট্রাক চালককে অপহরণের ঘটনা থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এর জেরে পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গোত্রীয় যোদ্ধারা সুয়েইদায় এসে বেদুইন সম্প্রদায়ের পক্ষে যোগ দেয়। এ সংঘর্ষে সিরিয়ার সরকারি সেনাবাহিনীও জড়িয়ে পড়ে। গত বুধবার এ সংঘাতে ইসরাইল হস্তক্ষেপ করে। তারা সুয়েইদা ও সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়।
ইসরাইল দাবি করে, তারা দ্রুজ সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্য এ পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ, সংখ্যালঘু এ গোষ্ঠীর নেতারা সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিলেন।

দ্রুজ হচ্ছে এক ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যারা সিরিয়া, লেবানন, ইসরাইল এবং দখলকৃত গোলান হাইটসে বসবাস করে এবং আরবি ভাষায় কথা বলে। যদিও অন্যান্য দেশেও তাদের কিছু সংখ্যক মানুষ আছে। দ্রুজ ধর্ম হলো শিয়া ইসলামের একটি শাখা যার নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় এবং বিশ্বাস রয়েছে। দ্রুজ সম্প্রদায় নিজেদের ‘মুয়াহিদুন’ বলে, যার মানে ‘যারা এক আল্লাহতে বিশ্বাস করে’।
‘দ্রুজ’ নামটি সম্পর্কে বলা হয় এটি দ্রুজ সন্ন্যাসী মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-দ্রুজি -এর নাম থেকে এসেছে, যিনি লেবানন ও সিরিয়ায় তার বিশ্বাস প্রচার করেছিলেন বলে জানা যায়। এই সম্প্রদায়ের প্রায় ১০ লাখ অনুসারীর মধ্যে অর্ধেকই সিরিয়ায় বসবাস করে, যেখানে তারা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন শতাংশ।
ইসরায়েলে দ্রুজ সম্প্রদায়কে সাধারণত রাষ্ট্রের অনুগত হিসেবে দেখা হয়, কারণ এর সদস্যরা সামরিক বাহিনীতে অংশ নেয়। ইসরাইলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের মতে, ইসরাইল ও ইসরাইলের দখল করা গোলান মালভূমিতে প্রায় এক লাখ ৫২ হাজার দ্রুজ বসবাস করে।
ইউরোপে হ্রদকেন্দ্রিক প্রাচীনতম বসতির সন্ধান