যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান এমন একটি পারমাণবিক চুক্তির চেষ্টা করছে যা উভয় পক্ষের জন্যই অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার মাত্র কয়েক দিন আগে রোববার এক ইরানি কূটনীতিকের বরাতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। খবর রয়টার্স।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কয়েক দশকের পুরনো বিরোধ মেটাতে এবং নতুন কোনো সামরিক সংঘাত এড়াতে চলতি মাসের শুরুতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় আলোচনা শুরু করে। মার্কিন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আলোচনা সফল না হলে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে।

ব্রাতিস্লাভায় এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কূটনীতি এবং আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতাকেই অগ্রাধিকার দেন, তবে এটি সফল নাও হতে পারে। রুবিও মন্তব্য করেন, ইরানের সঙ্গে আগে কেউ সফলভাবে চুক্তি করতে পারেনি, তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাবো।
মার্কিন বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার হুমকি দিলেও রোববার ইরানের পক্ষ থেকে কিছুটা নমনীয় অবস্থান দেখা গেছে।
আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক কূটনীতি বিষয়ক উপ-পরিচালক হামিদ কানবারি বলেন, একটি চুক্তির স্থায়িত্বের খাতিরে এটি জরুরি যে যুক্তরাষ্ট্রও যেন দ্রুত এবং উচ্চ অর্থনৈতিক মুনাফা পাওয়া যায় এমন খাতগুলো থেকে উপকৃত হয়।
কানবারির মতে, তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র, যৌথ ক্ষেত্র, খনিতে বিনিয়োগ এবং এমনকি বিমান ক্রয়ের মতো বিষয়গুলোও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। তিনি যুক্তি দেখান, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন এবং তেহরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করেছিলেন।
একটি সূত্র শুক্রবার রয়টার্সকে জানিয়েছে, স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সমন্বয়ে গঠিত একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল মঙ্গলবার জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। রোববার এক উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তা এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

রুবিও বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে বলেন, স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে সম্ভবত এই মুহূর্তেই ভ্রমণ করছেন। দেখা যাক এর ফলাফল কী দাঁড়ায়।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিটি বহুপাক্ষিক হলেও বর্তমান আলোচনা কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং ওমান এখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জেনেভার উদ্দেশ্যে তেহরান ত্যাগ করেছেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধানসহ অন্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
আপসের পথে ইরান
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি রবিবার বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিষেধাজ্ঞার বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচিতে আপসের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, চুক্তি করতে চায় কি না, তা প্রমাণ করার দায়িত্ব এখন আমেরিকার ওপর।
তিনি ইরানের নমনীয়তার উদাহরণ হিসেবে গত সোমবার দেশটির পারমাণবিক প্রধানের দেওয়া বিবৃতির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে ইরান তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তরলীকরণে সম্মত হতে পারে।

তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তেহরান ‘শূন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ’ নীতি মেনে নেবে না। অথচ ওয়াশিংটন মনে করে, ইরানের ভেতরে এই সমৃদ্ধকরণ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। যদিও ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির লক্ষ্য অস্বীকার করে আসছে।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বেশ কিছু পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বৃদ্ধি করছে।
অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চলতি সপ্তাহে এক বৈঠকে চীনে ইরানের তেল রপ্তানি কমানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশই হয় চীনে, তাই এই বাণিজ্যে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে ইরানের রাজস্ব আয়ে বড় ধরণের ধস নামবে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নির্ধারণে জেনেভায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক