বেইলি রোডের আগুনের যে বেদনা আর কষ্টের গল্প জন্ম দিয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। এক একটি মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চোখ ভেজানো সব গল্পের। শুক্রবার ঢাকা মেডিক্যালে কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে দিনভর ছিলো এমন অনেক গল্পের আহাজারিতে ভরা। বাতাস ছিলো ভারী।
দুই সন্তান ও স্ত্রীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ শিপন পোদ্দার। ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগের সামনে আহাজারি করছিলেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। আগুন দুর্ঘটনার কারণে পরিবারে আকস্মিকভাবে নেমে আসা এমন দুর্যোগকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন কেউ।
সন্তানদের আবদার মেটাতে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন শিপন পোদ্দারের স্ত্রী পপি রাণী ও তার দুই সন্তান। রাজধানীর বেইলি রোডের ভয়াবহ আগুনে মারা যান তারা। বৃহস্পতিবার রাতে বহুতল ভবনটিতে লাগা ভয়াবহ আগুনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ জনে।
ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে গ্রিন কোজি নামের এই ভবনের একটি রেস্তোরাঁয় খেতে যান শিপন পোদ্দারের স্ত্রী পপি রানী। সাথে ছিল সাত বছর বয়সী ছেলে সংকল্প ও তেরো বছর বয়সী মেয়ে সম্পূর্ণা। শিপন জানান, ওরা যখন ওখানে খেতে গেছে, তখনই আগুন লেগেছে। আমাকে ফোন দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি ঢাকার বাইরে ছিলাম। যখন ঠিক শান্তিনগর মোড়ে আসলাম, তখন আর কেউ ফোন ধরছিলো না। রাত পৌনে ১০টার দিকে গাড়ি চালক মোশাররফ হোসেনকে ফোন দিয়ে বাঁচার আকুতি জানান পপি রানী। কথা বলতে বলতেই নিস্তেজ হয় যায় তার কণ্ঠ।
মোশাররফ জানান, এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার পথেই আমাকে ফোন দেয় যে আমরা আটকা পড়েছি আগুনে। কোথায় লেগেছে? বলে যে- রেস্টুরেন্টের নিচে থেকে আগুন আসছে। তখন তাদের বলা হয়েছে যে আপনারা উপরে চলে যান ছাদের দিকে। ছেলে, মেয়ে, মা তিনজনের কেউই আর থাকল না।
পরিবারের তিনজনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্বামী ও স্বজনেরা। তাদের কান্নার কণ্ঠস্বর যেন বলছে, এমন মৃত্যু যেন আর কারো না হয়। পপির মা বলছিলেন, আমি কি এমন পাপ করেছি যে এত বড় শাস্তি পেলাম! সব শেষ হয়ে গেলো। তাঁকে সাত্ত্বনা দেয়া ভাষা কেউ খুঁজে পাচ্ছিলো না।
পপি রানীর এক স্বজন জানান, আমি ১০টার দিকে খবর পেয়েছি। ভাইয়ের শাশুড়ি ফোন করেছে যে বেইলি রোডে আগুন লেগেছে। ওরা ওখানে গেছে। আটকা পড়েছে। তখন থেকেই শুধু চারিদিকে ফোন দিয়ে খবর নিচ্ছি। কাচ্চি ভাইয়ে রাতের ডিনার শেষ করে আসবে। ওরা শান্তিবাগে থাকে। ছেলে মেয়েদের নিয়ে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান তারা। মূহুর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। কেমন ছিল সেই বিভিষিকার মুহূর্ত। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা, পুরো ভবনে অসংখ্য গ্যাস সিলিন্ডার মজুত ছিল। এমনকি সিঁড়িতেও মজুত ছিল সিলিন্ডার। ফলে ভবনটিতে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা ছিল না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বেইলি রোডের আগুনে ভিকারুননিসার শিক্ষক ও তার মেয়ের মৃত্যু