বেইলি রোডের আগুন কেবল ৪৬টি প্রাণই কেড়ে নেয়নি। অসংখ্য মানুষকে করেছে স্বজনহারা। নিমতলি বা চুড়িহাট্টার পর এই শহর আরও একবার সাক্ষী হলো সন্তানহারা বাবা মায়ের আর্তনাদ আর অজস্র মানুষের কান্নার। প্রিয়জনের মরদেহ নিয়ে ঘরে ফেরা স্বজনদের মুখে একটাই প্রশ্ন ছিলো, অপরিকল্পিত এই নগরে এমন মৃত্যুর মিছিল কি কখনোই থামবে না?
কি প্রানবন্ত মানুষই না ছিলেন অভিশ্রুতি শাস্ত্রী। তরুণ সাংবাদিক । কাজ করতেন একটি নিউজ পোর্টালে। বৃহস্পতিবার রাতে পরিচিতিদের সাথে রাতের খাবার খেতে বেইলি রোডে গিয়েছিলেন । শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত অজ্ঞাতনামা হিসেবে অভিশ্রুতির লাশ পড়েছিলো শেখ হাসিনা বার্ণ ইন্সটিটিউটের মর্গে। দুপুর নাগাদ তার পরিচয় জানাজানি হয়। নির্বাক তাঁর বন্ধু ও সহকর্মীরা।

স্ত্রী আর তিন সন্তানকে নিয়ে কয়েকদিন দিন পরই ইটালিতে স্থায়ীভাবে পাড়ি জমাতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৈয়দ মোবারক হোসেন। সেটি আর হলো না। বেইলি রোডের আগুন গোটা পরিবারের জীবনের গন্তব্যকেই বদলে দিলো। আগুনে পুড়ে মারা গেলো পরিবারের পাঁচ সদস্য, পড়ে রইলো ভিসা-পাসপোর্ট।
রেষ্টুরেন্টে রাতের খাবার খেতে গিয়ে বেইলি একসাথেই প্রাণ দিলেন মোবারক হোসেন, স্ত্রী স্বপ্না আক্তার, দুই মেয়ে কাশফিয়া, আমেনা নূর আর ছেলে আব্দুল্লাহ। শুক্রবার সকালে ঢাকা মেডিকেলের মর্গ থেকে পাঁচজনের নিথর দেহ নিয়ে স্বজনরা রওনা দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরে।
বাবাকে বলেছিলো অফিসের অনুষ্ঠানের জন্য বেইলি রোডে খাবার অর্ডার করেই বাসায় ফিরবে ২৪ বছরের তুষার হাওলাদার। তারও আর ফেরা হলোনা। কখনো ফিরবেও না। সন্তানের লাশের ভার কেমন করে সইবেন এই বাবা? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তুষার সম্প্রতি তাঁর গ্র্যাজুয়েশন অধ্যায় শেষ করেছেন।
১০ মার্চ ছিলো তাঁর সমাবর্তন অনুষ্ঠান। কথা ছিলো সেই অনুষ্ঠানে থাকবেন। সেটি আর হলো না। চাকরি ও পড়াশোনার পাশাপাশি দুই বছরের বেশি সময় ধরে চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছিলেন তুষার হাওলাদার। তার অকাল মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছেন সহপাঠিরাও।
অন্যদিকে, মালেয়িশয়া যাওয়ার কথা ছিল কুমিল্লার তরুণী রিয়ার। কাটা ছিল টিকেটও। ফ্লাইট শুক্রবার রাতে। কিন্তু বেইলি রোডের সেই আগুন কেড়ে নিলো একটি স্বপ্ন। ওই আগুন শুধু রিয়া নয়, কেড়ে নিয়েছে বোন আলিশার জীবন। নিহত দুই বোন ফৌজিয়া আফরিন রিয়া ও সাদিয়া আফরিন আলিশা।
রিয়া মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। আর সাদিয়া আফরিন আলিশা ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। একই দুর্ঘটনায় মারা গেছে, রিয়া ও আলিশার খালাতো বোন নুসরাত জাহান নিমু। সে ঢাকা সিটি কলেজের ছাত্রী। তারা একই সঙ্গে শপিং করতে গিয়েছিল।
বৃহস্পতিবার রাতে বেইলি রোডের আগুনে গ্রিন কোজি নামের ভবনে যখন আগুনের সূত্রপাত তখন বিভিন্ন তলার রেস্তোরাঁতে রাতের খাবার খেতে ব্যস্ত ছিলেন শত শত মানুষ। আগুন লাগার পরপরই শুরু হয়ে যায় হুড়োহুড়ি। কেউ দৌড়ে চলে যান ছাদে, কেউ দৌড়ে ছুটে যান সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেতে।

আর যারা ভেতরে আটকা পরেছিলেন, তাদের অনেকেই একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে নির্মমভাবেই না মারা গেলেন। অভিশ্রুতি, তুষার, কাশফিয়া, রিয়ার মতো ৪৬টি তাজা প্রাণ। ভাগ্য গুণে আগুন থেকে যারা বেঁচে ফিরেছেন ভয়ানক যন্ত্রনা নিয়ে তারা ভর্তি আছেন জাতীয় বার্ন ইন্সটিটিউটে।
দীর্ঘসময় আগুনে আটকে থেকে সবার রক্তেই ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টায় একটু একটু করে ওরা সেরে উঠছে। তবে কেউই এখনো শক্তামুক্ত নন। তবে চেষ্টার সর্বোচ্চ ঢেলে দিচ্ছেন বার্ন ইন্সটিটিউটের চিকিৎসকরা।
