নিয়ম আছে, রেস্টুরেন্ট করতে হলে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। থাকতে হবে কলকারখানা অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। লাইসেন্স দেয়ার আগে সরেজমিন তদন্ত করবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। কিন্তু বাস্তবতা হলো ঢাকার ৯০ শতাংশ রেস্টুরেন্টেরই কোনো লাইসেন্স নেই। একটি বাণিজ্যিক ভবনে কয়টি রেস্টুরেন্ট থাকতে পারবে নেই তার বিধিমালা।
ধানমন্ডি সাত মসজিদ রোডের গাউসিয়া টুইন পিক ভবনটি করা হয়েছে বাণিজ্যিক হিসেবে। কিন্তু নকশা করার সময় স্থপতিকে বলা হয়েছিলো অফিস। ভবনের ১৫টি তলাজুড়ে এখন রেস্টুরেন্টের সংখ্যা ১৯টি।
ভবনের স্থপতি মুস্তফা খালিদ পলাশ জানিয়েছেন, তার নকশা করা এই ভবনে এতো রেস্টুরেন্ট দেখে এক বছর আগে তিনি ডেভেলপারকে অকুপেন্সি সনদে সাক্ষর না করার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি।
মুস্তফা খালিদ পলাশ বলেন, স্থপতির স্বাক্ষর ছাড়া কোনো ভবন পাস হয় না। অকুপেন্সি সার্টিফিকেটের তোয়াক্কা কেউ করে না। ওটা ছাড়াই কাজ শুরু করে দিয়েছে।
তার মতে ১৯টি রেস্টুরেন্টে ৫০ জন করে মানুষ থাকরেও সংখ্যাটা কমপক্ষে ৮৫০ জন হবে। আগুনের মতো ঘটনা ঘটলে নকশায় থাকা সিড়ি দিয়ে এতো মানুষের নামতে পারাটা অসম্ভব। ভবনের ম্যানেজার জানালেন, এটি বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে অনুমোদন নেয়া। তাই রেস্টুরেন্ট হবে না অন্য কিছু হবে সেটি তাদের দেখার বিষয় নয়।
এই ভবনের কাছেই এমন আরও পাঁচটি ভবনে ৯২টি রেস্টুরেন্টের খোঁজ মিলেছে। যেগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো খারাপ।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিধিকে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন দেয়া হলেও রেস্টুরেন্টের কথা কোথাও বলা নেই। এই সুযোগই নিচ্ছেন ভবন মালিকরা।
ধানমন্ডি, মিরপুর, বনানী ও খিলগায় এমন শত শত রেস্টুরেন্ট। আইন অনুযায়ী রেস্টুরেন্ট করতে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন লাগে। এ ছাড়াও লাগে পরিবেশ, কলকারখানা অধিদপ্তর ও কাউন্সিলরের ছাড়পত্র। কিন্তু বাস্তবতা হলো ঢাকার ৯৫ শতাংশ রেস্টুরেন্টের কোনো লাইসেন্স নেই।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, অভিজাত এলাকায় যত রেস্তোরাঁ আছে এর ৯০ ভাগ আমাদের সদস্য নয়। তারা থোড়াই কেয়ার করে আমাদের। তাদের লাইন ঘাট অনেক বড়। তাদের ওখানে অভিযানও হয় না। খুব কম। লোক দেখানো। আমরা চাই সারাদেশের সব রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী কমপ্লায়েন্সের আওতায় আসুক।
আইন থাকলেও এসব কিছু না হওয়ার মূল কারণ সদিচ্ছার অভাব।
নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, সনদ না নিয়ে রেস্টুরেন্ট চালানোয় যেমন দায় আছে। আমি বলবো, তার চেয়ে বেশি দায় আছে রেগুলেটরি বডি, রাষ্ট্রযন্ত্র-সেখানে বেশি দায় আছে।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক আবু নাঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। আর আইনের প্রয়োগ থাকতে হবে। এদুটোর সমন্বয় যদি না থাকে তাহলে এরকম দুর্ঘটনা ঘটবে। আমরা দেখবো, লাশের পর লাশ যাচ্ছে।

একটি ভবনের কতোটুকু স্থানজুড়ে রেস্তোরা থাকতে পারবে সে ব্যাপারে নতুন বিধিমালা তৈরি করে, তা বাস্তবায়নে অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের মতো তৃতীয় পক্ষকে দায়িত্ব দেয়ার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।
গত বৃহস্পতিবার রাতে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের মালিকানাধীন গ্রিন কোজি কটেজ আগুন লাগে। ওই ভবনটির বিভিন্ন তলায় ছিলো নানান রেস্তোরাঁ।
কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে দমকলের কর্মীরা। ততক্ষণে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ও আগুনে নিহত হন বহু মানুষ।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ওই ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৪৬ জনের। হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন পাঁচজন।
পুড়ে যাওয়া ভবনে আগুনের সূত্রপাত একটি চা-কফির দোকান থেকেই হয়েছিলো বলে পুলিশের মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় ভবন মালিক আমিন মোহাম্মদ গ্রুপসহ দুইটি রোস্তোরার মালিকদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।
এদিকে আগুনে প্রাণহানির ঘটনার পরই রেস্তোরাঁর নিরাপদ পরিবেশ ও অনুমোদন দিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সারাদেশে সাড়ে চার লাখের বেশি রেস্তোরাঁ রয়েছে।
বেশিরভাগ রেস্তোরাঁয় নেই পর্যাপ্ত অগ্নি নিরাপত্তা, যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডার।
