হাসপাতালের মর্গে বাবা খুজঁছেন সন্তান। ভাই খুঁজছেন ভাইকে। পরিবারের কেউ মরদেহ শনাক্ত করছেন হাতের ঘড়ি দেখে। বৃহস্পতিবার রাতে বেইলি রোডে আগুনে পুড়ে নিহতদের স্বজনদের হাহাকারে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল জুড়ে তৈরি হয়েছে শোকাবহ পরিবেশ।
নিহত ৪৬ জনের মধ্যে ৪০ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ৪০ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া বাকি ছয় জনের মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) মর্গে রাখা হয়েছে। তাদের পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষ করা হচ্ছে।
শুক্রবার সকাল থেকেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগ আম মর্গের সামনে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। তাদের বেশিরভাগই এসেছেন আগুন হতাহতদের খোঁজ নিতে। বিশেষ করে যারা মার গেছেন, তাদের মরদেহ খুঁজে পাওয়ার জন্য মর্গের সামনে বাড়তে থাকে ভিড়, সেই সঙ্গে আহাজারি।
এক বাবা তার ২২ বছরের ছেলের মরদেহ খুঁজছেন। ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তান বন্ধুদের সাথে বেইলি রোডের পুড়ে যাওয়া ভবনটিতে খেতে গিয়েছিলো। শোকার্ত পরিবারের সদস্যরা সকাল থেকে চেষ্টা করছেন তার মরদেহ খুঁজে পাবার। তারা জেনে গেছেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাওয়া সন্তানটি আর বেঁচে নেই।
বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে আরেক বাবা। তখনই তিনি জানলেন তার ছোট ছেলে মিনহাজ আর বেঁচে নেই। মর্গের সামনে বড় ছেলে বাবাকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। মৃত্যুর আগ মুহুর্তে ফোনে বাবার কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলো ছেলে। সন্তানের লাশ নিতে এসে সেই কথাই বারবার বলছিলেন তিনি।
জরুরি বিভাগের সামনে ঢাকা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান জানান, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত নিহত ৪৬ জনের মধ্যে ৪১ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। ৩৯টি মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ৭ জনের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল ও জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ৩৯ জনের মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অজ্ঞাত সাতজনের মধ্যে পাঁচজনের মরদেহ এখনও কেউ দাবি করেনি। তাদের চেহারা বোঝা যাচ্ছে, তবে একটি মরদেহ পুড়ে একেবারে অঙ্গার হয়ে গেছে।
যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে-
- ফৌজিয়া আফরিন রিয়া (২২), পিত- কুরবান আলী, ঢাকার কাকরাইল।
- পপি রায় (৩৬), পিতা- প্রলেনাথ রায়, মা, বাসনা রানী রায়, ২১৬, মালিবাগ শান্তিবাগ ঢাকা।
- সপ্না পোদ্দার (১১), পিতা-শিপন পোদ্দার, মা- পপি রায়। সুত্রাপুর, দয়াগঞ্জ, ঢাকা।
- আশরাফুল ইসলাম আসিফ (২৫), পিতা-মৃত জহিরুল ইসলাম। খিলগাঁওয়ের উত্তর গোড়ান। স্থায়ী ঠিকানা- ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কসবা।
- নাজিয়া আক্তার (৩১), পিতা- মোহাম্মদ আলী, মা-নাজনীন আক্তার বেবি। ১৪, আরামবাগ, ঢাকা।
- আরহাম মোস্তফা আহামেদ ( ৬), পিতা- আশিক, মা-নাজিয়া আক্তার, ১৪, আরামবাগ, ঢাকা।
- নুরুল ইসলাম (৩২), পিতা- মুসলেম, বংশাল, বেচারাম দৌড়ি।
- সম্পা সাহা (৪৬), পিতা-জয়ন্ত কুমার পোদ্দার, কুমিল্লা মুরাদনগর উপজেলার নবিপুর।
- শান্ত হোসেন (২৪), পিতা- আমজাদ হোসেন, নারায়ণগঞ্জ, ফতুল্লা।
- মায়শা কবির মাহি (২১), পিতা- কবির খান, মতিঝিল এজিপি কলোনি।
- মেহেরা কবির দোলা (২৯), পিতা, কবির খান, মতিঝিল এজিপি কলোনি।
- জান্নাতি তাজরিন নিকিতা (২৩), পিতা, গোলাম মহিউদ্দিন, আর্কিট হাউস কাকরাইল শান্তিনগর কাকরাইল। ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
- লুৎফুর নাহার করিম (৫০), মা-জহুরা ইসলাম, রমনার সার্কিট হাউস। ভিকারুন্নেসার নূন স্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষিকা।
- মোহাম্মদ জিহাদ (২২), পিতা জাকির হোসেন, মাদারীপুর কালকিনি পূর্বচর আলিমবাগ। কামরুল হাসান (২০), পিতা কবির হাসান, যশোর সদর উপজেলার মধ্যপাড়া।
- দিদারুল হক (২৩), পিতা- মাইনুল হক, ভোলা সদর, উত্তর পাড়া।
- অ্যাড. আতাউর রহমান শামীম(৬৫),পিতা- ফজলুল রহমান। মৌলভীবাজার, কুলাউরা । যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা কালীন নেতা।
- মেহেদী হাসান (২৭), পিতা- মোয়াজ্জেম মিয়া, সাং টাঙ্গাইলের মির্জাপুর।
- নুসরাত জাহান শিমু (১৯), পিতা, আব্দুল কুদ্দুস কুমিল্লা সদর হাতিগাড়া।
- সৈয়দা ফাতেমা তুজ জোহরা (১৬), পিতা- সৈয়দ মোবারক কাউসার, ৩৭৭ মগবাজার মধুবাগ ঢাকা। স্থায়ী ঠিকানা- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার, কসবা শাহবাজপুর।
- সৈয়দ আব্দুল্লাহ (৮), সৈয়দ মোবারক কাউসার
- সপ্না আক্তার (৪০) আব্দুল্লাহর মা।
- ২৩ সৈয়দ মোবারক কাউসার (৪৮), পিতা, সৈয়দ আবুল কাশেম। ঠিকানা ঐ। ইটালি প্রবাসী ছিলেন।
- সৈয়দা আমেনা আক্তার নুর (১৩), সৈয়দ মোবারক কাওসার, শাহাবাজপুর ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
- জারিন তাসনিম প্রিয়তি (২০), পিতা আওলাদ হোসেন। মুন্সিগঞ্জ সদর বিনোদপুর।
- জুলেল গাজী (৩০), পিতা ইসমাইল গাজী, গুলশান, মডেল টাউন বাড্ডা।
- প্রিয়াংকা রায় (১৮) পিতা, উত্তম কুমার রায়, মা, রুবিয়া রায়, ১৩৪, মালিবাগ প্রথম লেন, শাজাহানপুর, ঢাকা।
- রুবি রায় ( ৪৮), স্বামী উত্তম কুমার রায়, ঠিকানা ঐ
- তুষার হাওলাদার (২৩), সাংবাদিকতা পাস করে , একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতো। পিতা, দিনেষ চন্দ্র হাওলাদার, ঝালকাঠি, কাঠালিয়া উপজেলার, তালগাছিয়া। বর্তমানে খিলগাঁও গোড়ান।
- সাগর হোসেন (২৪), সিকিউরিটিগার্ড, পিতা- তালেব প্রামাণিক, ফরিদপুর।
- নজিলা নওরিন (৩৫), পিতা- নুরুল আলম পিরোজপুর সদর।
- শিপন (২১), পিতা- ফজর আলী, শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার কালারচর
- আলিশা (১৩) পিতা কোরবার আলী, কালারচর, রমনার ১০৪,কাকরাইল।
- নাহিয়ান আমিন (১৯), পিতা- রিয়াজুল আমিন, বরিশাল সদর কাউনিয়া।
- সংকল্প সান (০৮) পিতা, শিপন পোদ্দার, যাত্রবাড়ি ২৬/সি দয়াগঞ্জ জেলেপাড়া ।
- লামিশা ইসলাম মাহি (২০), পিতা- নাসিরুল ইসলাম, রমনা মালিবাগ। এডিশনাল ডিআইজির মেয়ে।
- মো: নাঈম (১৮), পিতা, মো: নান্টু বরগুনা।
- মো: নয়ন (১৭) পিতা- সিরাজ, ভোলা সদর, চরকুমারিয়া।
- আসিফ ( ২৫) পিতা, আবুল খায়ের, নোয়াখালী, সেনবাগ।
হস্তান্তর হয়নি : দাবিদার রয়েছে-
- বৃষ্টি খাতুন ওরফে অভিশ্রুতি শাস্ত্রী (২৫), পিতা, সবুজ শেখ, কুষ্টিয়া, খোকসা উপজেলার বনগ্রাম। দ্যা রিপোর্ট ডট কমের রিপোর্টার ছিলেন।
- কে এম মিনহাজ উদ্দিন (২৫) পিতা, ওয়ালিউল্লাহ খান, চাদপুর সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রাম।
- নাজমুল ইসলাম (২৫), পিতা হাজী নজরুল ইসলাম।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি নামের ছয় তলা ভবনে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভাতে কাজ করে এবং রাত ১১টা ৫০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় ফায়ার সার্ভিস ৭৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করে।
