বেইলি রোডের আগুন কেড়ে নিয়েছে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের এক শিক্ষিকসহ সাবেক বর্তমান মিলিয়ে পাঁচ শিক্ষার্থীর প্রাণ। তাদের হারিয়ে শোকে বিহ্বল এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। আগুনে নিহতদের বাড়িতে বাড়িতে চলছে শোকের মাতম আর আহাজারি।
মেয়ে জান্নাতিন তাজরী নিকিতাকে নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে ব্যস্ত বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের কাচ্চি ভাই দোকানে বিরিয়ানি খেতে গিয়েছিলেন ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক লুৎফুন নাহার করিম লাকি। মা ও বোনের সঙ্গে কাচ্চি ভাইতে খেতে যাওয়ার কথা ছিল সাদমান সাকিবেরও।
তবে ভেতরে ঢোকেননি তিনি। বাইরে এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তখন ভবনের ভেতরে ছিলেন মা ও বোন। আগুন লাগার পর ওই ভবনে আরও অনেকের সঙ্গে আটকা পড়েন তারাও এবং আরও অনেকের সঙ্গে পুড়ে মারা যান মা-মেয়ে।
শুক্রবার দুপুরে ভিকারুননিসা স্কুলের মা ও বোনের জানাজার সময় সাদমানকে ধরে রেখেছিলেন তাঁর বন্ধুরা। এদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থাকলেও অংশ নেয়া হয়নি। সাকিব বলেন, অপেক্ষা করতে করতেই চোখের সামনে আগুন আর ধোঁয়া দেখতে পান। তিনি বলেন, আম্মুর মোবাইলে কল দিচ্ছিলাম বারবার।

শিক্ষক লাকির স্বামী গোলাম মহিউদ্দীন জানান, তার স্ত্রী দাঁতের ব্যথায় ভুগছিলেন। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তাই চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার পথে স্ত্রী ও মেয়েকে কাচ্চি খেয়ে আসার জন্য বলেছিলেন তিনি। বিলাপের সুরে সেই আক্ষেপই করছিলেন এই স্বজনহারা মানুষটি।
‘লাকি টিচার’ ছিলেন বেইলি রোডে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের (স্কুল শাখা) ব্যবসায়িক শিক্ষার শিক্ষক। তাঁর পুরো নাম লুৎফুন নাহার করিম (লাকি)। মেয়ে জান্নাতিন তাজরীও এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার রাতে বেইলি রোডে বহুতল ভবনে আগুনে মৃত্যু হয়েছে দুজনের।
শুধু এই দুজনই নন। বৃহস্পতিবার রাতের আগুনে মৃত্যু হয়েছে ভিকারুননিসার বর্তমান ও প্রাক্তন আরও তিন শিক্ষার্থীর। তাদের মধ্যে রয়েছে স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন। তার বোন ও ভিকারুননিসার প্রাক্তন শিক্ষার্থী ফওজিয়া আফরিন। আরেকজন হলেন লামিসা ইসলাম। তিনিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী। পড়াশোনা করছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগে।

রাজধানীর বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুলের মাঠে শুক্রবার বেলা ২টার দিকে প্রিয় ‘লাকি টিচার’ ও তাঁর মেয়ের মরদেহ পৌঁছার পর শুরু হয় কান্নার রোল। প্রিয় শিক্ষিককে এক নজর শেষ দেখা দেখতে জুমার নামাজের আগে থেকেই সেখানে আসেন তার ছাত্রী অভিভাবক আর তার সহকর্মীরা।
মাঠজুড়ে শিক্ষার্থীদের কান্নায় শোকার্ত হয়ে উঠে পরিবেশ। পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় দুজনের। জানাজা শেষে বেইলিরোডের আগুনে নিহত প্রিয় শিক্ষিকা ও তার মেয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানান শিক্ষার্থী ও স্কুল কর্তৃপক্ষ। বলেন সদা হাস্যোজ্জল এই শিক্ষিকার অকাল মুত্যু মেনে নেয়া যায় না।
শোকাহত এই মানুষগুলো বললেন, অব্যবস্থাপনা আর কর্তৃপক্ষের অবহেলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদের প্রিয়জন, দাবি করলেন সুষ্ঠু বিচারের। বেইলি রোডর আগুনে নিহত পাঁচ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় রোববার স্কুলটিতে শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
বেইলি রোডের আগুনে ভিকারুননিসার শিক্ষক ও তার মেয়ের মৃত্যু