অতি সম্প্রতি দুটো সাম্প্রতিক ঘটনায় গোটা বিশ্বজুড়ে শিরোরাম হয়েছে চীন। এর প্রথমটি হলো, চীনের সর্বাধুনিক রণতরী দ্য ফুজিয়ান প্রথমবারের মতো সমুদ্রে নেমেছে। আর দ্বিতীয়টি হলো, চাঁদের দূরবর্তী অংশের নমুনা সংগ্রহের জন্য চন্দ্রযান পাঠিয়েছে চীন, যা এর আগে কোন দেশ করে দেখাতে পারেনি।
এই দুই ঘটনাই বলে দিচ্ছে জল ও মহাকাশে চীনের অগ্রযাত্রার কথা। নৌশক্তিতে বিশ্বের কোন দেশ সবার উপরে এনিয়ে বিতর্ক চলতে পারে, তবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকারের নৌবাহিনী রয়েছে চীনের কাছে। এখন শুধু আর বাহিনীর সংখ্যায় নয়, নৌ সমর শক্তিতেও বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত চীন।
চীন সাগর থেকে শুরু করে তাইওয়ান প্রণালিতে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। সেখানে নাক গলাতে সদা প্রস্তুত আমেরিকা। আর চীন সেটা কিছুতেই হতে দেবে না। নিজেদের জলসীমায় অন্য কোন দেশের মাস্তানি মেনে নেবে না বেইজিং। সেই লক্ষ্য বহুদিন আগ থেকেই নিজেদের তৈরি করছে দেশটি।

বেইজিং মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাইওয়ানকে দেওয়া নিরাপত্তা গ্যারান্টিই এই অঞ্চলে নিরাপত্তা হুমকির বড় উৎস। বর্তমানে পাঁচটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। এই জলসীমা নিয়ন্ত্রণ নিতে বেইজিং তাদের নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
এতোদিন চীনা নৌবাহিনীতে দুটি বিমানবাহী রণতরী ছিলো, যাদের নাম লিয়াওনিং ও শানডং। এই বহরটিতে এবার তৃতীয় রণতরী যুক্ত হলো। এটির নাম ‘দ্য ফুজিয়ান’। সাংহাই থেকে পূর্ব চীন সাগরের উদ্দেশে পহেলা মে রণতরীটি তার পরীক্ষামূলক অভিযান শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে এ রণতরী নির্মাণ করেছে চীন। এটি চীনের নিজেদের নির্মাণ করা তৃতীয় রণতরী। জিয়াংনান শিপইয়ার্ডে ফুজিয়ানকে নির্মাণ করতে মোট ছয় বছর সময় লেগেছে। ২০২২ সালে এই যুদ্ধজাহাজের উদ্বোধন হলেও এবারই প্রথম সমুদ্রে পাঠানো হয়েছে।

বিমানবাহী রণতরী ‘দ্য ফুজিয়ান’ সমুদ্রযাত্রার পর এর শক্তি ও সক্ষমতা জানতে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে নানা মহলে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই ফুজিয়ানের চেয়ে বড় রণতরী রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের রণতরীগুলোর সঙ্গে এটি কতটা পাল্লা দেবে তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।
বলা হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের এই চীনা রণতরীট বিশ্বের সেরা মার্কিন রণতরী ইউএএস জেরাল্ড আর ফোর্ড থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, কৌশলগতভাবে চীনা নৌশক্তিকে বহদূরে এগিয়ে নেবে। একমাত্র জ্বালানি সক্ষমতা ছাড়া অন্যান্য দিকে থেকে খুব একটা পিছিয়ে থাকবে না দ্যা ফুজিয়ান।
চীনা এই রণতরীটি ৪০ হাজার টন ওজন বহনে সক্ষম। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৬ মিটার এবং প্রস্থে ৩৯ মিটার চওড়া। এই বাহকটিতে দুই হাজার ক্রু এক সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। এর বাইরেও বিমান বাহিনীর এক হাজার সদস্য এই রণতরীতে মোতায়েন করা যাবে।
ফুজিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফিচার হলো, তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্যাটাপাল্ট সিস্টেম, যার মাধ্যমে চীনের অপর দুই রণতরীর তুলনায় অপেক্ষাকৃত ভারী যুদ্ধবিমান এই জাহাজ থেকে উড়ে যেতে পারবে। সেই সঙ্গে যুদ্ধবিমান আরও দূর গন্তব্যে পাঠানো সম্ভব হবে। পুরোনো দুই রণতরীতে স্কি-জাম্প প্রক্রিয়া ব্যবহার হয়।
ডেকে থেকে যুদ্ধবিমান উড়ানোর জন্য এতে ব্লাস্টশিল্ড সহ তিনটি ক্যাটাপল্ট লেন রয়েছে। এই বিমানগুলো আগের তুলনায় আরও বেশি গোলাবারুদ বহন করতে পারবে। এটি ৬০টি বিমান বহন করতে পারবে। এর মধ্যে ৪০টি যুদ্ধবিমান ছাড়াও অ্যান্টি-সাবমেরিন হেলিকপ্টার, গোয়েন্দা ও টহল বিমান বহনে সক্ষম।
ঘন্টায় ৫৬ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে সক্ষম দ্য ফুজিয়ান প্রথাগত জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে এ রণতরীকে নিয়মিত বিরতিতে কোনো বন্দর থেকে অথবা অন্য তেলের ট্যাঙ্কার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজগুলো পারমাণবিক শক্তিতে পরিচালিত।

চীনের এই রণতরীতে স্থাপিত রাডার সিস্টেম দূরপাল্লার মিসাইল ট্র্যাক করতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে আগে থকেই যে কোন হুমকি মোকাবেলায় সক্ষম এই যুদ্ধজাহাজটি। সার্বিকভাবে, এই রণতরী চীনের নৌযুদ্ধ সক্ষমতাকে অনেকাংশ বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা ৩৪০টি। রণতরীর সংখ্যা বাড়াতে চায় চীন। তাই, চতুর্থ ও পঞ্চম রণতরীর ঘোষণা খুব দ্রুতই আসতে পারে। এসব রণতরী পারমাণবিক জ্বালানিচালিত হতে পারে ইঙ্গিত দিয়েছেন চীনের সামরিক কর্মকর্তার।
