সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আগেই একটি উড়োজাহাজে চেপে পালিয়ে যান দেশটির স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদ। প্রথমে তার গন্তব্য সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও, রোববার রাতে জানা যায়, বাশার তার পরিবার নিয়ে দীর্ঘ দিনের মিত্র রাশিয়াতে আছেন।
রাশিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম ক্রেমলিনের সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, রাশিয়া আসাদকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়া এ ঘোষণা করেনি। রাশিয়ার সরকারি মিডিয়া জানিয়েছে, আসাদ ও তার পরিবার এখন থেকে রাশিয়ায় থাকবেন। তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হবে।
বাপ-বেটা মিলে সিরিয়ায় ৫০ বছরের বেশি সময় শাসন করেছে আসাদ পরিবার। কিন্তু সেই শাসনের অবসান ঘটতে লেগেছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এক সপ্তাহের বেশি সময় আগে শুরু হওয়া বিদ্রোহীদের অভিযান এত দ্রুত শেষ হয়ে যাবে, বাশার আসাদ তা কল্পনাও করতে পারেননি। তাই পলিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
আসাদ যতদিন সিরিয়ায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন, ততদিন রাশিয়া ছিল তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু দেশ। সিরিয়া ছাড়ার পর আসাদ সপরিবারে এখন রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। পরে, ক্রেমলিন সোমবার জানিয়েছে, মানবিক কারণে তারা আসাদকে আশ্রয় দিয়েছেন।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আসাদ সিরিয়া ছেড়েছেন এবং ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে. বিদ্রোহী যোদ্ধারা রোববার কোনো বাধা ছাড়াই দামেস্ক দখল করে নেয়, যার মাধ্যমে আসাদ পরিবারের প্রায় ছয় দশকের কঠোর শাসনের অবসান ঘটে।
এর আগে, প্রায় এক দশক ধরে বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা ছিলেন রাশিয়ার সামরিক সহায়তার ওপরে ভর করে। এমনকি দু’দিন আগেও বিদ্রোহীরা যখন দামেস্ক দখলের উদ্দেশ্য আলেপ্পো ও হামা দখল করে নেয়, তখনও রাশিয়ার বোমারু ফাইটারগুলো বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রাকে ঠেকাতে তৎপর ছিলো।
মাত্র ১৬ দিনের মাথায় ক্রেমলিনের সিরিয়া মিশনের এমন পরিণতি হবে সেটা কল্পনাতেও আনা যায়নি। তবে এখনই দমে যাচ্ছে না রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মস্কো গভীর উদ্বেগের সঙ্গে সিরিয়ার নাটকীয় ঘটনাগুলোকে অনুসরণ করছে। যথাযথ সময়ে মস্কো তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে।

সিরিয়ার বিরোধী ও বিদ্রোহী নেতারা দেশটিতে রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি এবং কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বাশার আল-আসাদের পতনের সশস্ত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি স্বয়ং এই কথা জানিয়েছেন।
সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বিশ্বের শক্দিধর দেশগুলো জন্য সব সময়েই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাশারের বাবা হাফিজ আল-আসাদ ক্ষমতায় আসার পরই তার মস্কো প্রীতি সিরিয়াকে ঠেলে দেয় জটিল এক রাজনৈতিক সমীকারণের দিকে। সিরিয়া হয়ে উঠে মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্ব রাজনীতির দাবার কোর্ট।
এই সিরিয়া নিয়েই যেন রাজনীতির কোন শেষ নেই। এখানে সারা বছর নিজেদের আধিপত্য জাহির করতে ব্যস্ত- ইরান, রাশিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি ইসরাইলও। দশকের পর দশক ধরে সিরিয়ায় চলছে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি। সৃষ্টি হয়েছে আইএসের মতো জঙ্গি গোষ্ঠি। যেন বিশ্বের বুকে যুদ্ধকে টিকিয়েই রেখেছে সিরিয়া।
বিশ্ব জানে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমি পুতিনের প্রত্যক্ষ মদদেই এতদিন সিরিয়ার ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন বাশার আল-আসাদ। অবশেষে সেই আসাদ সরকারের পতন হয়েছে। খুব গোপনে রাজধানী দামেস্কো ছেড়ে পালিয়েছেন। ফলে সিরিয়াতে যে খেলা চলছিল সেখানে পরাজিত হয়েছেন পুতিনও।

বাশার আল-আসাদের পতন যে মস্কোর জন্য বড় ধরনের এক আঘাত, সেটি পরিষ্কার। ২০১৫ সালে বাশারের সমর্থনে হাজার হাজার সেনা সিরিয়ায় পাঠায় রাশিয়া, যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নিজেদেরকে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে জাহির করা। কারণ এর আগে মার্কিন সমর শক্তিও জঙ্গি নির্মূলে অভিযান শুরু করেছিলো।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর পশ্চিমা ক্ষমতা ও আধিপত্যকে সেবারই প্রথম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন। সে সময় তার এই উদ্দেশ্য অনেকটাই সফল হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ২০১৭ সালে পুতিন সিরিয়ার হামাইমিম বিমান ঘাঁটি পরিদর্শনে গিয়ে মিশন সফল হওয়ার ঘোষণাও দেন।
সামরিক সহায়তার বিনিময়ে সিরিয়ার কর্তৃপক্ষ হামেইমিম বিমান ঘাঁটি এবং তারতুস নৌঘাঁটি ৪৯ বছরের জন্য লিজ দিয়েছিল রাশিয়াকে। এর মাধ্যমে রাশিয়া পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে। এই দুটি ঘাঁটি আফ্রিকা এবং আফ্রিকার বাইরের রাশিয়ার অস্ত্র ব্যবসায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হয়।

২০১৬ সালে রাশিয়া ও ইরানের মদদ নিয়ে আলেপ্পো শহর পুনর্দখল করে আসাদ বাহিনী। এর আগে কয়েক বছর তুমুল লড়াই হয় বিদ্রোহীদের সঙ্গে। তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আল-শামের সঙ্গে জোট বাধে বিরোধী গ্রুপ। ফলে আগেই ধারণা করা হচ্ছিলো, যে কোনো সময় পালিয়ে যেতে পারেন বাশার আল আসাদ।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিরিয়ায় রাশিয়ার ঘাঁটিগুলোর কী হবে? রুশ কর্মকর্তারা সিরিয়ার সশস্ত্র বিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। সিরিয়ার বিরোধী দলের নেতারা রুশ ঘাঁটি এবং সবগুলো কূটনৈতিক মিশনেন নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দুই ঘাঁটিতে নিরাপত্তা সমস্যা নেই।
মস্কো জানিয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিরিয়ার জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত এবং রাশিয়া-সিরিয়া সম্পর্কের উন্নতিতে আগ্রহী পুতিন। এ বিষয়ে রাজনৈতিক সংলাপ চালিয়ে যেতে চান তিনি। একই সঙ্গে সিরিয়ার সঙ্কট সমাধানে জাতিসংঘের উদ্যেগে আলোচনা শুরু করার তাগিদও দিয়েছে ক্রেমলিন।
বাশার আল-আসাদ ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার কট্টর মিত্র। ক্রেমলিনও দীর্ঘদিন তার জন্য প্রচুর ব্যয় করেছে। এখন বাশারের পতন যে কোনো ধাক্কা নয়, বরং পেছনে অন্য কিছু ছিল, সেটি প্রমাণের জন্য রুশ কর্তৃপক্ষকে রীতিমত লড়াই করতে হবে। ‘বলির পাঁঠা’ কাকে বানানো যায়, সেই চেষ্টাই তারা করছে।
রোববার রাতে তার প্রমাণ দেখা গেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক সাপ্তাহিক নিউজ শোতে, যেখানে সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করে বলা হয়, তারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার চেষ্টাই করেনি।

অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ইয়েভগেনি কিসেলেভ বলেন, সবাই দেখছিল সিরিয়ার কর্তৃপক্ষের জন্য ঘটনা ক্রমেই নাটকীয় হয়ে উঠছিল। আলেপ্পোতে কার্যত কোনো লড়াই ছাড়াই অবস্থান ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সেনারা বেশ সুসজ্জিত এবং হামলাকারীদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি থাকলেও সুরক্ষিত এলাকাগুলোতে একের পর এক আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটে এবং পরে সেসব অবস্থান উড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি একটি রহস্য!
৯ বছর ধরে বাশারকে ক্ষমতায় রাখতে রাশিয়া ব্যাপক বিনিয়োগ করলেও, চিন্তিত হওয়ার হওয়ার মতো যে আরো বিষয় রয়েছে, সেটি রুশ জনগণকে এরিমধ্যে মনে করিয়ে দিয়েছে দেশটির বলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই মুহূর্তে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেন যুদ্ধ অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন উঠছে, বাশার আল-আসাদের পতন কি শুধুমাত্র দেশীয় বিদ্রোহীদের কারণে, নাকি তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাশিয়া তার প্রতি আগ্রহ হারানোর ফল? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাশিয়া থেকে আসাদের পৃষ্ঠপোষকতার সমর্থন কমে যাওয়াই তার পলায়নের পেছনে মূল কারণ হতে পারে।
বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো সিরিয়া পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, সিরিয়া একটি বিশৃঙ্খল রাষ্ট্র, আমাদের বন্ধু নয় এবং এখানে আমাদের কিছু করার নেই। তবে, আসাদের পতনের পর ট্রাম্প আবারও টুইট করে দাবি করেছেন, আসাদ রাশিয়ার সমর্থন হারিয়ে পালিয়েছেন এবং তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার পেছনে ভ্লাদিমির পুতিনের ভূমিকা রয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই অস্ত্র দিয়ে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সহযোগিতা করে আসছে। ২০১৪ সালে তারা আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে। এতে যোগ দেয় ইসরাইলও। চালায় বোমা হামলা। সেই সাথে তুরস্ক, সৌদি ও মার্কিন সমর্থিত সশস্ত্র বিরোধীরা আসাদকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকে।
অবশেষে পতন হয় আসাদ সরকারের। শাম অঞ্চলের সমৃদ্ধশালী দেশ সিরিয়ায় একই ভূমিকায় দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রকে। দেশটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন ঘটেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র রীতিমতো চোখ বুঝে ছিল। যদিও সিরিয়াতে আমেরিকার বেশ কয়েকটি ঘাঁটি রয়েছে।
তবে সিরিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমানে জটিল পরিস্থিতি আপেক্ষা করছে। সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব জোলানি এক সময় মার্কিন কারাবন্দি ছিলেন। অথচ সে কারাবন্দিই এখন পুরো সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তাই এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ত থাকার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আবার সিরিয়া অস্থিতিশীল থাকলে মার্কিন তেল ও অস্ত্র ব্যবসার জন্যও সেটা লাভের। আর মিত্র ইসরাইলের জন্য তো পুরোই আশীর্বাদ। ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও তেহরানকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া গেল এর মাধ্যমে। অন্যদিকে, তুরস্ক তেল আর অস্ত্র ব্যবসার দালিল করার সুযোগও হাতছাড়া করবে না।
