পাকিস্তানের করাচি! পৃথিবীতে বাঙালিদের সবচেয়ে বড় ১০টি শহরের একটি। দেশটির সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর এই করাচি। বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে প্রায় ৩০ লাখ বাঙালির বসবাস। এরমধ্যে শুধুমাত্র করাচিতেই ২০ লাখের মতো বাঙালির বসবাস। যাদের প্রতিনিয়তই সেখানকার অধিবাসীরা লাঞ্ছনা গঞ্জনা করে থাকে। তাদের বিশ্বাসঘাতক, জালিম বলেও শুনতে হয় অপবাদ।
পাকিস্তানের সবচেয়ে ঘনবসিতপূর্ণ শহর হিসেবেও পরিচিত করাচি। দেশের বন্দরশহর, সাবেক রাজধানী এবং বর্তমানে অলিখিত বাণিজ্যিক রাজধানী। দ্য ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্সের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, করাচি পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক শহরও। আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাঙের জন্যে বিখ্যাত। প্রতিনিয়ত এখানে মারামারি হানাহানি চলতেই থাকে। আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের মদতদাতার পাশাপাশি জঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘর তকমাতো আছেই।
ব্রিটিশ আমলে বাঙালিরা প্রথম করাচি শহরে পা রাখে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে বাঙালি জেলেদের নিয়ে যান করাচি উর্দুভাষী ব্যবসায়ীরা। ওরাঙ্গি টাউন, ইব্রাহিম হায়দারি কলোনি, বিলাল কলোনি, জিয়াউল হক কলোনি, মূসা কলোনি, মাচার কলোনি, চিটাগং কলোনি এবং ল্যারির বাঙালি পাড়ায় বাঙালি বসতি সবচেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্সও করা যায়।

করাচিকে ছোট্ট বাংলাদেশ বলে থাকেন স্থানীয় বহু মানুষ। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পর বাঙালিদের কিছুটা আপন করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। তার পেছনে অন্যতম কারণ হলো ভারত বিদ্বেষ। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কপাল পুড়ে পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙালিদের। সেই থেকে তারা হয়ে ওঠে পাকিস্তানি মীরজাফর। ঘৃণা, বৈষম্য-চরম নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে পাকিস্তানকে আপন ভেবে সেখানে পাড়ি জমানো বাঙালিরা।
বংশ পরম্পরায় পাকিস্তানে থেকেও এখনো তাদের কপালে জোটেনি জাতীয় পরিচয়পত্র। কাজ করতে হচ্ছে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে। সেটিও নিতে হচ্ছে ঘুষ দিয়ে। নোংরা-ঘিঞ্জি বস্তিতে থাকতে হচ্ছে বাংলা ভাষাভাষীদের। দিনের প্রায় ২০ ঘণ্টাই সেখানে থাকেনা বিদ্যুৎ। দিনে একবার খাওয়ার পানির জোগান আসে। নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গেলে পুলিশি ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকা মেলে না শিক্ষা। কেনা যায় না জমি বা বাড়ি।

দেশটির গণমাধ্যমগুলো বলছে, নাগরিকত্ব না থাকায় এবং বৈধ কোনো কাগজ পত্র না থাকায় কোন ব্যবসা বা কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে না বাঙালিরা। এমনকি কেউ কেউ গোপনে কাজ করলেও পুলিশের হাতে ধরা খেলে থাকতে হয় কারাগারে। নিম্নমানের কাজ করা এসব বাঙালিকে পরবর্তীতে ছেড়ে দিলেও তাদেরকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। শিক্ষা বঞ্চিত হওয়ায় ছোটবেলা থেকে শিশুরা বিভিন্ন ধরণের ছোটখাটো কাজে নেমে পড়ে।
ফুটপাথে হকার, সবজি বিক্রি, ছোটখাটো কারখানায় নামমাত্র মজুরি নিয়ে কাজ করে। আবার অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে চলে যায়। করাচির মাছ ব্যবসা মূলত বাঙালিদের ওপরেই নির্ভরশীল। সে কারণে তারা চায় না বাঙালিরা পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাক। কিন্তু বাঙালিদের নাগরিকত্ব এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন নিয়ে তাদের কোন পরিকল্পনা নেই। এই নিয়ে দেশটির রাজনীতিবিদেরাও উদাসীন।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে আসা মানুষদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা রাখেননি। বারবার আন্দোলন করেও লাভ হয়নি। একদিকে পাকিস্তানের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি অন্যদিকে পুলিশি নির্যাতন-অবহেলার যুগের পর যুগ ধরে শোষিত-নিপীড়িত হয়ে পাকিস্তানে বসবাস করছে বাঙালি জনগোষ্ঠীরা। মানবেতর জীবন যাপন করছে। অথচ যাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।
উন্নত দেশেও আছে কোটা পদ্ধতি, তবে...