গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম দুই দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে ইসরাইল পৌঁছেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক আঞ্চলিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। মোদী যখন জেরুজালেমে পৌঁছান তখনও গাজা উপত্যকায় বোমা ফেলেছে ইসরাইল।
নরেন্দ্র মোদি বুধবার বেন-গুরিয়ান বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মোদী সরকারের আমলে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে যে কৌশলগত মৈত্রী গড়ে উঠেছে, এই সফর তাকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সফরের সূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মোদি ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেবেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মোদির এই সফরে ফিলিস্তিনি নেতাদের সঙ্গে কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা রাখা হয়নি। সফরের প্রাক্কালে নেসেট ভবনকে ভারতীয় পতাকার রঙে সাজানো হয়, যা দুই দেশের গভীর বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই সফরের মূল লক্ষ্য দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ রক্ষা করা। বিশেষ করে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ইসরাইল বর্তমানে ভারতের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। আধুনিক যুদ্ধকৌশল এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সরঞ্জাম ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই সফর ভারতের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা। একদিকে ভারত ৭ অক্টোবরের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইসরাইলের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে, অন্যদিকে গাজায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ‘টু-স্টেট সলিউশন’ বা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের নীতিতে অটল রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশ এবং ইরানের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের হুমকির প্রেক্ষাপটে ভারত অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেসেটে ভাষণ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে চলমান বিবাদের জেরে বিরোধী দলগুলো মোদির ভাষণ বয়কটের হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে ভারতেও প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই সফরের সমালোচনা করে অভিযোগ করেছে, মোদী সরকার ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে সরে আসছে।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক কবির তানেজা মনে করেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি হলো নিজেদের দ্বিপাক্ষিক প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া এবং অন্য অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নাক না গলানো। তিনি বলেন, ভারত যেমন নিজের বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও তারা একই নীতি অনুসরণ করে।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই সফর প্রমাণ করে, ভারত এখন আদর্শিক রাজনীতির চেয়ে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। উদ্ভাবন, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে ভারত ও ইসরাইলের এই ‘শক্তিশালী অক্ষ’ আগামী দিনে বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
মোদী-নেতানিয়াহু ‘কেমিস্ট্রি’ ও বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায়