আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা চালানোর অনেক আগেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি নিজস্ব এক মারণাস্ত্র তৈরি করে রেখেছিল; শত্রুর সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে রুখে দিতে বিশ্বের প্রধান জ্বালানি করিডোরকে ‘বন্ধক’ রাখা। ইরানি পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত আঞ্চলিক তিনটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

কয়েক দশক ধরেই ইরান ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল, যদি তাকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়া হয়, তবে তারা হরমুজ প্রণালীতে ট্যাংকার চলাচল সীমিত করে দেবে। এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথটি ইরানের শত্রুপক্ষীয় দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে দুর্বল জায়গা, কারণ এখানে সামান্য বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পারস্য উপসাগরের এই প্রধান রপ্তানি ধমনীকে নিশানা করে তেহরান অঞ্চলের বৃহত্তম অর্থনৈতিক সম্পদকে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ হাতিয়ারে পরিণত করেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী দিয়ে পার হয়। প্রণালীর উত্তর উপকূলে অবস্থিত ইরান এখন কার্যত এটি বন্ধ করে দিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ৯৭ শতাংশ কমে গেছে।
ইরান আগেও এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে। ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ‘ট্যাংকার যুদ্ধে’ জাহাজগুলোর ওপর হামলার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক জলপথে পরিণত হয়েছিল, যা ওয়াশিংটনকে বাধ্য করেছিল সামরিক পাহারায় ট্যাংকার পার করে দিতে।
তবে ইরান এখন অনেক বেশি শক্তিশালী সরঞ্জামে সজ্জিত। তাদের হাতে সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, যা অনেক বড় এলাকাজুড়ে নৌ-চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মাসের হামলাগুলো প্রমাণ করেছে, সাগরে ব্যাপকভাবে মাইন না পেতেও তেহরান কত দ্রুত এই প্রণালীর ট্রাফিক অচল করে দিতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতি জিম্মি হলে ট্রাম্প নতিস্বীকার করবেন: ভায়েজ
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, ইরান সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে আছে, সরাসরি মোকাবিলায় তাদের পক্ষে জেতা অসম্ভব। গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর আমেরিকা ও ইসরাইলের পক্ষ থেকে আরও হামলার আশঙ্কা করে তেহরান খতিয়ে দেখেছিল কীভাবে এই সংঘাতকে সময় ও পরিসরে বিস্তৃত করা যায়।
ভায়েজ আরও যোগ করেন, ইরান যদি বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে ফেলে, তবে ট্রাম্পই সবার আগে নতিস্বীকার করবেন।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানায়, ইরানের প্রভাবশালী ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস ইসরাইল ও ওয়াশিংটনের সাথে এই চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য দীর্ঘকাল ধরে প্রস্তুতি নিয়ে আসছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর গার্ড বাহিনীর এই পরিকল্পনাটি সক্রিয় করা হয়। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিম-বিরোধী ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা।
সূত্রমতে, এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো উচ্চতর সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ইরানের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে নেয়া। তাই তেহরানের পরিকল্পনাকারীরা সরাসরি যুদ্ধের বদলে তেল সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং অঞ্চলজুড়ে মোতায়েন করা মার্কিন সম্পদের ওপর ‘অপ্রতিসম’ হামলা চালানোর পথ বেছে নিয়েছে।

সামরিক সংঘাতকে অর্থনৈতিক ধাক্কায় রূপান্তর
এই কৌশলের লক্ষ্য হলো দেশে এবং বিদেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর এমন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা যাতে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হন। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মাইকেল আইজেনস্ট্যাড বলেন, এটি হলো অপ্রতিসম যুদ্ধের এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে ইরান সামান্য কয়েকটি হামলার মাধ্যমে বিশাল প্রভাব ফেলে এবং শত্রুপক্ষকে চরম মূল্য দিতে বাধ্য করে।
তিনি আরও বলেন, লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করা, যা আমেরিকায় যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন কমিয়ে দেবে এবং ওয়াশিংটনকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপে ফেলবে।
একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তি ঘনীভূত না করে তেহরান পুরো উপসাগরজুড়ে সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঢেউ ছড়িয়ে দিচ্ছে। অতীতে এই ধরনের কাজ ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া ও লেবাননে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে করানো হতো।
সূত্রগুলো বলছে, আইআরজিসির এই ডকট্রিন কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে যে, কোনো যুদ্ধের শুরুতে শক্তিশালী শত্রু সবসময় ইরানের নেতৃত্ব ও কমান্ড কাঠামো ধ্বংস করার চেষ্টা করবে। গার্ড বাহিনী আমেরিকার সাথে বছরের পর বছর ধরে চলা ‘ছায়া যুদ্ধের’ শিক্ষাগুলো এখানে কাজে লাগাচ্ছে। তবে এবার প্রক্সি বা মিত্র বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে তেহরান নিজেই সরাসরি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

আমেরিকার কৌশলে দূরদর্শিতার অভাব: ভায়েজ
আলী ভায়েজ মনে করেন, আমেরিকা অপ্রস্তুত অবস্থায় এই যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং তাদের কৌশলে বাস্তবতার চেয়ে আকাশকুসুম চিন্তা বেশি ছিল। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন হামলা, নৌ-পথের বিঘ্ন বা নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি। আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ঝুঁকি বুঝতে না পারাই ছিল তাদের বড় ব্যর্থতা।
অন্যদিকে, ইরানের বিকেন্দ্রীভূত ‘মোজাইক’ ডকট্রিন (যেখানে নেতৃত্ব ধ্বংস হলেও আলাদা আলাদা কেন্দ্র থেকে যুদ্ধ চালানো যায়) এখনো অটুট রয়েছে। খামেনেই-এর মৃত্যুর পরেও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ (সাবেক গার্ড কমান্ডার) এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিদানি তেহরান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন বলে দুটি সূত্র জানিয়েছে।
ভায়েজের যুক্তি হলো, আমেরিকা ইরানকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করতে পারলেও পুরোপুরি পরাজিত করতে হলে স্থল অভিযানের প্রয়োজন হবে, যাতে দুর্গম ভূখণ্ডে প্রায় ১০ লাখ সেনা লাগবে। ওয়াশিংটনের সেই মানসিক শক্তি নেই। ট্রাম্প, যিনি একসময় আমেরিকাকে ‘বোকার মতো’ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এখন একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরাক ও আফগানিস্তান অভিযানের পর এটিই আমেরিকার বড় সামরিক অভিযান হতে যাচ্ছে।
ভায়েজের মতে, ইরানের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য হলো টিকে থাকা। আর দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো ওয়াশিংটনকে এটা বোঝানো যে, সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক চাপ বা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা দিয়ে জবরদস্তি করার নীতি কাজ করে না। এই শিক্ষা আমেরিকা আদৌ নেবে কি না তা অনিশ্চিত। তবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং যুদ্ধের ময়দানকে দেশের সীমানার বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে তেহরান বাজি ধরছে যে, তারা অনেক বেশি শক্তিশালী শত্রুর চেয়েও বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে।
‘আত্মঘাতী’ ড্রোন বোট: হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন রণকৌশল