আমেরিকার জনপ্রিয় সিটি সিরিজ ‘ফ্রেন্ডস’, এদেশেও সমানভাবে জনপ্রিয় হয়েছিলো ক্যাবল টিভি আসার কারণে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই এই সিটিং-কমেডি বা সিট-কমের চ্যান্ডলার বিং চরিত্রে অভিনয় করে বেশ জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি পেয়েছিলেন অভিনেতা ম্যাথিউ পেরি। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তার এই মৃত্যু কোন স্বাভাবিক মৃত্যু ছিলো না।
কানাডা বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নাগরিক অনেক বছর ধরে হতাশা ও মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়ছিলেন। নিয়মিত মাদক নিতেন। অতিরিক্ত কেটামিন সেবনের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে তার মৃত্যুর তদন্ত নামে আমেরিকার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা- এফবিআই। বেরিয়ে আসতে শুরু করে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। দায়ের হয় মামলা। সে মামলায় পাঁচ ব্যক্তি লস অ্যাঞ্জেলেসের কেন্দ্রীয় আদালতে দোষ স্বীকার করেছেন।

তাদেরই একজন জাসভিন সাঙ্গা। আপত দৃষ্টিতে একজন সাধারণ মার্কিন তরুণী হলেও তিনি একই সঙ্গে দুই জীবন যাপন করতেন। মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসছে জাসভিন বিশাল এক মাদক চক্রের সঙ্গে জড়িত। জানা যায়, তিনি মাদক কারবারের একটি বড় নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত। তিনি ধনী ও বলিউড তারকাদের মাদক সরবরাহ দিতেন। পেয়েছিলেন ‘কেটামিন কুইন’ উপাধি। তার সম্পর্কে প্রতিবেদন করেছে বিবিসি।
জসভিন সাঙ্গা হলে এমন একজন নারী, যার জীবনের সব কিছুই ছিলো গড় মার্কিন জীবনযাত্রার চেয়ে বেশ উন্নত। তিনি সবই পেয়েছেন ছোটোবেলা থেকে। ধনী পরিবারে বেড়ে উঠা, ভালো শিক্ষা এবং বন্ধুদের বিশাল এক বৃত্ত। সবকিছু মিলিয়ে মনে হতে পারে পরীর মতো জীবন তার। কিন্তু তিনি এখন অভিনেতা ম্যাথিউ পেরির মৃত্যুর সাথে জড়িত মামলায় চূড়ান্ত দণ্ডপ্রাপ্ত হতে চলেছেন।
হলিউডের অভিজাতদের কাছে মাদক সরবরাহকারী হিসাবে পরিচিত এই নারী তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছ থেকেও নিজের অন্ধকার দিকটি লুকিয়ে রেখেছিলেন। ব্রিটিশ-আমেরিকান দ্বৈত জাতীয়তার অধিকারী জসভিন এখন ম্যাথিউ পেরির মৃত্যুসংক্রান্ত মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তিনি পেরিকে সরবরাহ করা ৫০ শিশি কেটামিনের সাথে জড়িত ছিলেন, যার মধ্যে একটি ডোজ তার মৃত্যুর কারণ হয়।

লস অ্যাঞ্জেলেসের এই মাদক নেটওয়ার্কের শেষ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে ফেব্রুয়ারিতে তার সাজা ঘোষণার কথা রয়েছে, যেখানে তাকে সর্বোচ্চ ৬৫ বছর জেলের মুখোমুখি হতে হতে পারে। কারণ মামলাটির তদন্তে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে একটি গোপন কেটামিন নেটওয়ার্কের খবর উঠে এসেছে। এই নেটওয়ার্কের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন জাসভিন সাঙ্গা। ফেডারেল আদালত তাঁর বিরুদ্ধে সাজার রায় ঘোষণা করবে।
আভিজাত্যের আড়ালে জাসভিনের দ্বৈত জীবন
বাহ্যিকভাবে জাসভিনের জীবন ছিল প্রাচুর্যময়। তিনি লন্ডনের ফ্যাশন রিটেইল মাল্টিমিলিয়নিয়ার দাদা-দাদির উত্তরাধিকারী ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি লন্ডনের হাল্ট ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ করেন এবং পরে লস অ্যাঞ্জেলেসে একটি ছোটোখাটো ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করেন। ব্যবসা ভালো মতোই এগিয়ে যেতে থাকলেও, মাদক পাচারকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

মাদক পাচার থেকে প্রাপ্ত অর্থ সামাজিক মাধ্যমে নিজের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে ব্যয় করতেন। তুলনামূলকভাবে একটি বড় মাদক পাচার নেটওয়ার্ক চালাতেন তিনি। এ নেটওয়ার্ক হলিউডের ধনী ও বিখ্যাতদের কাছে মাদক সরবরাহ করতেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) বিশেষ এজেন্ট ইন চার্জ বিল বডনার বিবিসিকে এনিয়ে বিস্তর তথ্য দিয়েছেন।
বিল বডনার জানান, জাসভিন সাঙ্গা উচ্চশিক্ষিত হয়েছে মাদককে জীবনের অংশ করেছিলেন এবং তিনি সমাজে প্রভাব বিস্তারের জন্য উন্মুখ ছিলেন। তিনি কোকেন, জানাক্স, নকল অ্যাডারাল এবং কেটামিনসহ নানা মাদকের একটি গুদাম ঘর পরিচালনা করতেন। হলিউডের অভিজাত ও ধনী ব্যক্তিরা ছিলো তার টার্গেট। তাদের কাছে নানাভাবে পৌঁছে দিতেন মাদক। যদিও জাসভিন কখনও সামনে আসতেন না।

জাসভিনের দীর্ঘদিনের বন্ধু টনি মার্কেজ ও যশ নেগান্ধি কেউই তার মাদক ব্যবসার বিষয়ে কিছু জানতেন না। মার্কেজ বলেন, জাসভিন সব সময়ই ধনী ছিলেন এবং ব্যক্তিগত জেটে ভ্রমণ করতেন। নেগান্ধি বলেন, তিনি তার বন্ধুর মাদক ব্যবসায়ী হওয়ার খবর শুনে সম্পূর্ণ হতবাক হয়েছিলেন। বন্ধু টনি মার্কেজের মতে, জাসভিন লস অ্যাঞ্জেলেসের পার্টি সার্কিটে সক্রিয় ছিলেন এবং কিটিজ নামে একটি ঘনিষ্ঠ দলের সদস্য ছিলেন।
তারা তারকাদের উপস্থিতিতে কয়েক দিন ধরে চলা পার্টি করতেন, যেখানে পিল ও কেটামিন ব্যবহার করা হতো। মার্কেজ মনে করেন, জাসভিন অর্থের চেয়েও বেশি আসক্ত ছিলেন সামাজিক মর্যাদায়। মার্কেজ বিবিসিকে বলেন, আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে, জাসভিন সেলিব্রিটিদের কাছে মাদক বিক্রির প্রতি আসক্ত ছিলেন না বরং সেই বৃত্তে থাকার এবং সেলিব্রিটিদের কাছের ব্যক্তি হবার জন্য লালায়িত ছিলেন।

এই দলটি মাদকে ফেন্টানাইল মেশানোর বিপদ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলো, তাই তারা মেক্সিকোর দুর্নীতিগ্রস্ত পশু চিকিৎসক ও ফার্মেসি থেকে উচ্চমানের কেটামিন সংগ্রহ করার একটি চক্র গড়ে তোলে।
পেরির মৃত্যু এবং পূর্বের শিকার
প্রসিকিউটররা প্রকাশ করেছেন, ম্যাথিউ পেরির মৃত্যু জাসভিনের মাদকের প্রথম শিকার ছিল না। ২০১৯ সালে জাসভিন কোডি ম্যাকলরি নামে এক ব্যক্তির কাছে কেটামিন বিক্রি করেছিলেন, যার অতিরিক্ত সেবনে মৃত্যু হয়। ম্যাকলরির বোন জাসভিনকে টেক্সট করে জানিয়েছিলেন যে তার সরবরাহ করা মাদকেই তার ভাই মারা গেছে। এই ঘটনা জানার পরেও জাসভিন তার ব্যবসা চালিয়ে যান।
সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর মার্টিন এস্ট্রাদা বলেন, সেই মুহূর্তে যে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে যেতেন। কিন্তু জাসভিন তার মাদকের ব্যবসা চালিয়ে যান এবং আমরা দেখেছি কয়েক বছর পরে তার আচরণের ধারাবাহিকতা মিস্টার পেরির মতো আরও একজনের মৃত্যু ঘটায়। তবে জাসভিন ব্যক্তিগতভাবে ম্যাথিউ পেরিকে চিনতেন না।

মামলার নথি মতে, পেরি শুরুর দিকে হতাশাজনিত সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে বৈধ ও চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী কেটামিন ব্যবহার করতেন। কিন্তু পরে তিনি চিকিৎসকের নির্দেশনার চেয়ে বেশি পরিমাণে কেটামিন সেবন করতে চাইলেন। এ পর্যায়ে পেরি একাধিক চিকিৎসক ও পরে এক মাদক কারবারির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই কারবারি এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে জাসভিনের কাছ থেকে মাদক সরবরাহ করতেন।
এখন সাজার অপেক্ষায় জাসভিন সাঙ্গা
উদ্যোক্তা নাইলেম সিং ও বালজিত সিং চোকারের মেয়ে জাসভিন উত্তরাধিকারসূত্রে পরিবারের সম্পদ পেয়েছিলেন। তার মা পরে আরও দুবার বিয়ে করেছিলেন। একটা সময় তিনি লন্ডন ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যালাবাসাস শহরে চলে যান। জাসভিন সেখানে বেড়ে ওঠেন। লস অ্যাঞ্জেলেসে তাঁর পারিবারিক বাড়িকে ‘সুন্দর’ ও ‘বড়’ বলে মনে মন্তব্য করেছেন বন্ধু মার্কেস।
জাসভিন ‘স্টিলেটো নেইল বার’ নামের রূপচর্চার একটি দোকান খুলেছিলেন। কিন্তু এটি বেশি দিন চলেনি। বন্ধুদের নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করতেন। রেস্তোরাঁ ফ্র্যাঞ্চাইজি চালানো ছিল তাঁর এমনই একটি পরিকল্পনা। কয়েক মাস আগে সাঙ্গার নর্থ হলিউডের বিশাল ও অভিজাত বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালায়। প্রসিকিউটরেরা এ বাড়িকে ‘গোপন ডেরা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
জানা যায়, জাসভিন ২০০০ সালের দশকে একবার পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়েছিলেন এবং তার আইনজীবী দাবি করেছেন, তিনি ১৭ মাস ধরে নেশামুক্ত ছিলেন। তার শেষ কথোপকথনে, তিনি বন্ধু নেগান্ধিকে তার সুস্থ জীবন এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে বলেছিলেন, কিন্তু গ্রেপ্তারের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিলেন। জাসভিন ফেব্রুয়ারিতে দণ্ডিত হতে চলেছেন। তার সাজার মাধ্যমেই হলিউডের অভিজাতদের মাদক সরবরাহকারী এই গোপন নেটওয়ার্কের মামলার সমাপ্তি ঘটবে।
হার্টের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে নচিকেতা, এখন বিপদমুক্ত
ষাটে নতুন প্রেম, অবশেষে গৌরীকে নিয়ে মুখ খুললেন আমির খান