টানা তৃতীয়বারের মত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে নরেন্দ্র মোদী। তবে সফল রাজনীতিবিদ মোদীর পথ চলায় ছিলো নানা উত্থান-পতন, আলোচনা আর সমালোচনা। নরেন্দ্র মোদীর মতো এতো আলোচিত, সমালোচিত, নিন্দিত, নন্দিত ও বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী ভারত দেখেনি। তাঁর মতো নির্বাচনী সাফল্যও আর কেউ পাননি। রাজ্য ও কেন্দ্রে এমন দাপটের সঙ্গে টানা রাজত্বও কেউ করেননি।
নরেন্দ্র মোদীই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যিনি ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকে দুইটি শিবিরে ভাগ করেছেন। একদিকে অনুগামীসহ বিরাজমান তিনি নিজে, অন্যদিকে বাকি সবাই। তিনি অনন্যও। অতীতের কোনো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন শুরুর আগেই নিজের জয় ঘোষণা করেননি।
সেই নির্ঘোষে যেমন রয়েছে অহংবোধের বিচ্ছুরণ, তেমনই বুঝিয়ে দেয় নিজের ক্ষমতার প্রতি কী অগাধ আস্থা তাঁর। তিনিই একমাত্র রাজনীতিক, যিনি প্রায় সিকি শতক ধরে প্রথমে নিজের রাজ্য গুজরাট ও তারপর গোটা দেশের রাজনৈতিক কাণ্ডারি হয়ে রয়েছেন। এই প্রবাহের গতি আদৌ রুদ্ধ করা সম্ভব কি না, গোটা দেশ আপাতত সেই চিন্তায় বিভোর। রাজনীতিক মোদির সাফল্য এটাই।
মোদীর জীবনটা সাদামাটা অথচ বিতর্কে ভরপুর। ভারত স্বাধীন হওয়ার তিন বছর পর অর্থাৎ ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গুজরাটের ভাদনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মোদী। তার বাবা দামোদার দাস মোদী এবং মায়ের নাম হিরাবা মোদী। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।
নিতান্তই সাদামাটা ছিলো তাঁর জীবন। সকাল দেখে সারাটা দিন কেমন যাবে বোঝা গেলেও মোদির জীবনের শুরু দেখে কেউ ভাবেনি একদিন তিনি এমন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রাজনীতিক হবেন। পড়াশোনায় মন ও মতি কোনোটাই তাঁর ছিল না। জানা যায়, গুজরাটের ভাডনগর স্টেশনে তাঁর বাবার একটা চায়ের দোকান ছিল।
সেখানে তিনি বাবাকে সাহায্য করতেন। তাঁর জীবন ঘিরে বিতর্কের শুরুও ওই পর্ব থেকেই। চা বিক্রেতার সন্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া ভারতীয় গণতন্ত্রের সাফল্যের সেরা বিজ্ঞাপন। তিনি নিজেই বারবার সে কথা নানাভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন।
গুজরাটের ভাডনগরের ছোট্ট ওই জনপদের স্কুলেই মোদীর শিক্ষা লাভ। ছোট থেকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ও স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে পরিব্রাজক হয়ে গৃহত্যাগ। আশ্রয় নিয়েছেন রামকৃষ্ণ মিশনে। যদিও গৃহত্যাগের আগেই দার পরিগ্রহ।
মোদীর বিয়ে হয়েছিল যশোদাবেনের সঙ্গে। তবে আর পাঁচজনের মতো বিবাহিত জীবন তিনি কাটাননি। সংসারধর্ম পালন করেননি। যশোদাবেনকে প্রকৃত অর্থে স্ত্রীর মর্যাদা কখনো দেননি। আবার আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের পথেও হাঁটেননি। নির্বাচনী হলফনামায় বিবাহিত জীবন নিয়ে তিনি নীরব থেকেছেন।

প্রথম স্বীকারোক্তি ২০১৪ সালে। লোকসভা ভোটের প্রার্থী হওয়ার সময় মনোনয়নপত্রে তিনি প্রথমবার স্ত্রী হিসেবে যশোদাবেনের উল্লেখ করেছিলেন। বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ এনেছিলো। লাভ হয়নি। কারণ, ভারতে রাজনীতিকের বিবাহিত জীবন নিয়ে আগ্রহ নেই জনমনে।
এবার ভোটের প্রচারে বিরোধীদের ‘পরিবারতন্ত্রের’ সমালোচনায় মুখর মোদীকে পরিবারকে অবহেলা করার কটাক্ষ শুনতে হয়েছে। তিনি উত্তরে বলেছেন, গোটা দেশ আমার পরিবার। ১৪০ কোটি মানুষ আমার আত্মীয়। মোদী সেই বিরল রাজনীতিক, যিনি সমালোচনার তীর বিরোধীদের দিকে ঘুরিয়ে দিতে দক্ষ।
ভারতের রাজনীতিতে বিতর্ক ও নরেন্দ্র মোদি যেন সমার্থক। দুটোই যেন সমান্তরাল রেললাইন। মোদীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আজও অমীমাংসিত। সত্যিই তিনি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী কি না, সরকারি বয়ান সত্ত্বেও সেই সংশয় ঘোচেনি। তিনি নিজেও রা কাড়েননি একটিবারের জন্যও।
মোদিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক অবশ্যই গুজরাট দাঙ্গা। ২০০২ সালের সেই দাঙ্গায় সরকারি হিসেবে নিহত হয়েছিলেন হাজারো মানুষ, যাঁদের মধ্যে ৭৯০ জন ছিলেন মুসলমান। বেসরকারি হিসেবে সংখ্যা দ্বিগুণ। মোদী তখন মুখ্যমন্ত্রী। অভিযোগ, দাঙ্গা থামাতে তিনি আদৌ সচেষ্ট হননি।
সেই দাঙ্গার পর ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার মোদীর ভিসার আবেদন পর্যন্ত খারিজ করে দিয়েছিলো। ২০১২ সালে সুপ্রিমকোর্ট নিযুক্ত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দাঙ্গায় মোদীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ খারিজ হয়ে যায়। দুই বছর পর দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় সেই যুক্তরাষ্ট্রই মোদিকে রেড কার্পেট অভ্যর্থনা জানাতে দ্বিধা করেনি।
রাজনীতি ও কূটনীতিতে নীতির চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থই সব সময় প্রধান বিবেচ্য। বিতর্ক সরিয়ে সেই মোদী এখন পশ্চিমা শক্তির কাছে ‘বিশ্বগুরু’! রাজনীতিতে মোদির উত্থান ও নিরন্তর সাফল্যের রহস্য কী? তিনি উচ্চাকাঙ্ক্ষী, পরিশ্রমী, কঠোর। গণতান্ত্রিক মোড়কের আড়ালে তিনি একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী।
মোদী ভারতের একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যিনি ১০ বছরে একবারের জন্যও সংবাদ সম্মেলন করেননি; যা খুশি প্রশ্ন করার অধিকার কাউকে দেননি। সংসদে সদস্যদের প্রশ্নের জবাব দেননি। ১০ বছর ধরে যা কিছু বলার, যা কিছু শোনানোর, তা তিনি একাই বলেছেন। দেশবাসীকে শুনিয়ে গেছেন।
একবারও কারো কাছে জবাবদিহি করেননি। এভাবে তিনি গড়ে তোলেন এক নতুন সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতিকে সর্বজনগ্রাহ্য করে তুলতে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন ধর্মের। গুজরাট দাঙ্গায় মুসলিম বিদ্বেষ স্পষ্ট করে তোলার পর বাকি ছিল নিজেকে হিন্দু হৃদয়ের একচ্ছত্র সম্রাট রূপে জাহির করা।
১০ বছর ধরে সেই চেষ্টা তিনি করে গেছেন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা লাভের মধ্য দিয়ে। আইনের সাহায্য নিয়ে মীমাংসা করেছেন অযোধ্যা বিতর্কের।তৈরি হয়েছে রামমন্দির। আইনের সাহায্য নিয়ে তাঁরা এগোচ্ছেন কাশী ও মথুরার ‘মুক্তির’ দিকেও। রাজনৈতিক এই সাফল্য অবশ্যই মোদী উপভোগ করছেন।
বিরোধীদের হাল ছাড়া রাখার কৃতিত্বও তাঁর প্রাপ্য। রাজনীতি তাঁর সংজ্ঞায় এক যুদ্ধ। গুজরাটের স্থানীয় নেতা থেকে আজ দিল্লির মসনদ তৃতীয়বারের মত মোদীর হাতের মুঠোয়। শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং আত্মবিশ্বাস তাকে বিশ্বের শক্তিধর নেতাদের কাতারে নিয়ে গেছে।
