গাজা উপত্যকার ওপর হামাসের কোনো কর্তৃত্ব থাকতে পারবে না- এমন শর্তেই ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তি হলেও, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটি ভিন্ন পথে হাঁটছে। হামাস নীরবে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা।
তারা বলছেন, মুরগির মাংসের দাম নির্ধারণ করা থেকে শুরু করে সিগারেটের উপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে গোষ্ঠীটি নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছে। এমন পরিস্থিতিতে, গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন পরিকল্পনা ধীরে ধীরে আকার নিলেও, হামাস ক্ষমতা ছেড়ে দেবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শুল্ক আরোপ
গত মাসে যুদ্ধবিরতি শুরু হবার পর, যে এলাকাগুলো থেকে ইসরাইল সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে, হামাস দ্রুত সেগুলোর উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেছে। এ সময় ইসরাইলের সাথে সহযোগিতা, চুরি বা অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে তারা ডজন খানেক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে।
গাজার ডজন খানেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা এখন হামাসের নিয়ন্ত্রণ আরও নানাভাবে অনুভব করছেন। হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করা প্রতিটি জিনিসের উপর কর্তৃপক্ষ নজর রাখছে। ১০ বাসিন্দা জানিয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে আমদানি করা কিছু পণ্য, যেমন জ্বালানি তেল ও সিগারেটের উপর শুল্ক বা ফি আরোপ করা হচ্ছে। এছাড়াও, যেসব ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন, তাদের জরিমানা করা হচ্ছে।

গাজা সরকারের মিডিয়া অফিসের প্রধান ইসমাইল আল-থাওয়াবতা অবশ্য সিগারেট ও জ্বালানি তেলের উপর কর আরোপের খবর অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, সরকার কোনো কর বৃদ্ধি করছে না। থাওয়াবতা বলেন, বিশৃঙ্খলা এড়াতে তারা কেবল জরুরি মানবিক ও প্রশাসনিক কাজ করছেন এবং দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, হামাস নতুন প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রস্তুত।
অর্থনীতির বেহাল দশা
প্রায় দুই বছরের যুদ্ধ বিধ্বস্ত গাজার সাধারণ মানুষ এখন অর্থনৈতিক দুরবস্থার শিকার। মধ্য গাজার নুসেইরাত এলাকায় কেনাকাটা করার সময় মোহাম্মদ খলিফা বলেন, দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সত্ত্বেও তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। তার কথায়, এটা যেন একটি স্টক এক্সচেঞ্জের মতো। দাম অনেক বেশি। কোনো আয় নেই, পরিস্থিতি কঠিন, জীবন দুর্বিষহ এবং শীত আসছে।
গাজার একটি বিপণী বিতানের মালিক হাতেম আবু দালাল স্বীকার করেছেন, পর্যাপ্ত পরিমাণে পণ্য গাজায় প্রবেশ না করায় দাম বেড়েছে। তবে তিনি জানান, সরকারি প্রতিনিধিরা পরিস্থিতি সামলাতে ঘুরে ঘুরে পণ্য পরীক্ষা করছেন এবং দাম বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও মার্কিন প্রতিক্রিয়া
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো গাইথ আল-ওমারি মনে করেন, হামাসের এই পদক্ষেপগুলো গাজাবাসী এবং বৈদেশিক শক্তি উভয়ের কাছেই এই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে, হামাসকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যত দেরি করবে, হামাস তত বেশি গেঁড়ে বসবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপাত্র স্পষ্ট জানিয়েছেন, এ কারণেই হামাস গাজায় শাসন করতে পারবে না। তিনি আরও যোগ করেন, জাতিসংঘের অনুমোদন সাপেক্ষে একটি নতুন গাজা সরকার গঠিত হতে পারে এবং বহুজাতিক নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে।

হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহ পার্টির গাজা মুখপাত্র মুনথের আল-হায়েক বলেছেন, হামাসের এই কার্যক্রম স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, হামাস শাসন চালিয়ে যেতে চায়। গাজা সিটি অ্যাক্টিভিস্ট মুস্তাফা ইব্রাহিম মনে করেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিলম্বের সুযোগ নিচ্ছে হামাস।
নজরদারির জাল
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খাদ্য আমদানিকারক জানিয়েছেন, হামাস পুরোপুরি কর নীতিতে ফিরে না গেলেও তারা সব কিছু দেখছে এবং রেকর্ড করছে। তারা রুট বরাবর চেকপয়েন্ট বসিয়ে প্রবেশ করা সব কিছুর উপর নজর রাখছে, ট্রাক থামিয়ে চালকদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। যদিও মূল্য কারসাজির জন্য জরিমানা করায় কিছু জিনিসের দাম কমেছে, তবে তা যুদ্ধের আগের তুলনায় এখনও অনেক বেশি।
বর্তমানে হামাসের হাজার হাজার সরকারি কর্মী রয়েছেন, যাদের বেতন তারা যুদ্ধকালীন সময়েও নিয়মিত পরিশোধ করে চলেছে। নতুন প্রশাসনের আগমন না হওয়া পর্যন্ত হামাস নিজেদের শাসন আরও শক্তিশালী করার সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
শ্রীনগরে থানায় বিস্ফোরণকে নিছক দুর্ঘটনা বলছে কাশ্মীরের পুলিশ