ভারতের লোকসভায় এবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর মধ্যে তীব্র বিতর্ক মধ্যেই ওয়াকআউন করে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের বিরোধী সংসদ সদস্যরা। নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে লোকসভায় আলোচনার এক পর্যায়ে অমিত শাহ ও রাহুল গান্ধীর মধ্যে চরম বাকযুদ্ধ শুরু হয়। ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি নিয়ে রাহুল গান্ধী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি সংবাদ সম্মেলনের মুখোমুখি হবার চ্যালেঞ্জ দেয়ার পর বিজেপি নেতা অমিত শাহ পাল্টা জবাব দেন, তিনি কীভাবে কথা বলবেন তা কেউ বলে পারে না।
বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করে শাহ বলেন, তারা একদিকে ভোটার তালিকায় অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ করছেন, আবার অন্যদিকে এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) এর বিরোধিতা করছেন, যার লক্ষ্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা এবং শুধুমাত্র যোগ্য ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা।
শাহ কটাক্ষ করে বলেন, যখন আপনারা জেতেন, তখন ভোটার তালিকা সম্পূর্ণ ঠিক থাকে, আপনারা নতুন পোশাক পরে শপথ নেন। কিন্তু বিহারের মতো রাজ্যে যখন মুখ থুবড়ে পড়েন, তখন বলেন ভোটার তালিকায় সমস্যা, এই দ্বৈত মানদণ্ড আর চলবে না।
ভোটার তালিকা নিয়ে রাহুল গান্ধীর প্রেস কনফারেন্স, যার একটিকে 'হাইড্রোজেন বোমা' বলা হয়েছিল, সেটিকে কটাক্ষ করে শাহ বলেন, বিরোধী দলনেতা ‘ভোট চুরি’-র কথা বলেন, অথচ কিছু পরিবার (স্পষ্টত নেহেরু-গান্ধী পরিবারকে ইঙ্গিত করে) হলেন ‘বংশগত ভোট চোর’।

এই সময়ে রাহুল গান্ধী বাধা দিয়ে শাহকে প্রথমে উত্তর দিতে বলেন, কেন নির্বাচন কমিশনারদের পদে থাকার সময় নেয়া যে কোনো পদক্ষেপের জন্য দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। নিজ সাংবাদিক সম্মেলনের উদাহরণগুলো মন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন অভিযোগ করে রাহুল গান্ধী চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন।
তিনি বলেন, চলুন আমার সাংবাদিক সম্মেলন নিয়ে বিতর্ক করি। চলুন.. অমিত শাহ জি, আমি আপনাকে তিনটি সাংবাদিক সম্মেলন নিয়ে বিতর্কের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি।
ক্ষুব্ধ শাহ পাল্টা জবাব দেন, আমি একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিতে চাই। ৩০ বছর ধরে বিধানসভা ও সংসদে নির্বাচিত হয়ে আসছি। আমার ব্যাপক অভিজ্ঞতা আছে। বিরোধী দলনেতা চান, আমি প্রথমে এই বা সেই প্রশ্নের উত্তর দিই। আমি তাকে স্পষ্ট করে দিচ্ছি, সংসদ আপনার ইচ্ছামতো চলবে না। আমি কীভাবে কথা বলব, তার ক্রম আমি ঠিক করব। তাঁর ধৈর্য ধরে আমার জবাব শোনা উচিত, আমি সব কিছুর উত্তর দেব। আমার বক্তব্যের ক্রম তিনি ঠিক করবেন না।
রাহুল গান্ধী শাহের এই প্রতিক্রিয়াকে ‘প্রতিরক্ষামূলক এবং ভীত’ বলে অভিহিত করে পিছু হটতে রাজি হননি। শাহ জবাব দেন, তিনি উস্কানিতে সাড়া দেবেন না এবং বলেন, যখন জনগণের রায়কে অস্বীকার করা হয়, তখনই আসল ‘ভোট চুরি’ হয়।

এরপর শাহ নেহেরু-গান্ধী পরিবারকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময় প্রথম ‘ভোট চুরি’ হয়েছিল। তিনি বলেন, সেই সময়ে প্রদেশগুলোর কংগ্রেস ইউনিটের প্রধানদের সবার একটি করে ভোট দেয়ার কথা ছিল।
শাহ দাবি করেন, মোট ২৮টি ভোট গিয়েছিল সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের পক্ষে এবং জওহরলাল নেহেরুর পক্ষে গিয়েছিল দুটি ভোট। কিন্তু নেহেরুজিই শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাঁর এই মন্তব্যে বিরোধী বেঞ্চে তীব্র হট্টগোল শুরু হয়।
‘ভোট চুরি’-র আরেকটি উদাহরণ টেনে অমিত অভিযোগ করেন, যখন ইন্দিরা গান্ধী রায়বেরেলি থেকে জয়ী হন, তখন নির্বাচনটি এলাহাবাদ হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়। আদালতের রায়ে সেই নির্বাচন বাতিল হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেটি ছিল একটা বিশাল ‘ভোট চুরি’। আর, তারপর কী হলো? সেই ‘’ভোট চুরি’ লুকানোর জন্য তিনি একটি আইন আনলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা যাবে না। বিরোধী দলনেতা নির্বাচন কমিশনারদের দায়মুক্তির কথা বলছেন, আমি তার জবাব দেব, কিন্তু তিনি এই বিষয়ে কী বলবেন? তিনি নিজেকেই দায়মুক্তি দিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, এরপর তিনি জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে বিচারপতিদের টপকে চতুর্থ স্থানে থাকা একজনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে বেছে নিলেন এবং তারপর সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি জিতলেন। এটি ইতিহাস, মনে হচ্ছে তাদের কেউ এটি শেখায়নি।
সোনিয়া গান্ধীকে লক্ষ্য করে তিনি অভিযোগ করেন, দেশের নাগরিক হওয়ার আগেই তিনি ভোট দিয়েছিলেন মর্মে আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। কংগ্রেস এমপিরা আপত্তি জানালে শাহ বলেন, আমি শুধু একটি তথ্য বলেছি।
সবশেষে শাহ ইভিএম ব্যবহারে রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস ও বিরোধীদের আপত্তির পাল্টা জবাব দেন এবং বলেন যে, এসআইআর-এর বিরোধিতার পেছনে তাদের আসল উদ্দেশ্য হলো, অবৈধ অভিবাসীরা যেন ভোটার তালিকায় থেকে যায়, তা নিশ্চিত করা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরই বিরোধীরা লোকসভা থেকে ওয়াকআউট করে। ওয়াকআউটের কারণ সম্পর্কে রাহুল গান্ধী সংসদের বাইরে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব ছিল প্রতিরক্ষামূলক এবং তিনি আমাদের উত্থাপিত বিষয়গুলোর জবাব দেননি। তিনি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা, ইভিএম কাঠামোর স্বচ্ছতা বা আমার সাংবাদিক সম্মেলনে দেয়া জোরালো প্রমাণের বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।
