ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মিরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামের একটি ছোট মসজিদের ভেতরে জড়ো হওয়া একদল মুসলিম পুরুষের চোখে-মুখে উৎসবের কোনো আনন্দ নেই। উত্তর ভারতের প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে বাঁচতে মাথার ওপর সিলিং ফ্যানগুলো ঘুরছে, আর প্রায় ৫০ জন মুসল্লি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যদের নির্দেশনা শুনছেন।
ভারতের জাতীয় রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) দূরের এই গ্রামের মসজিদে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু আজ কোরবানির পশু কিংবা দান-খয়রাত নয়; বরং তার চেয়েও এক চরম বাস্তব ও উদ্বেগজনক বিষয়—রাস্তাঘাট, ব্যারিকেড, পুলিশের অনুমতি এবং ঠিক কোথায় ও কীভাবে বৃহস্পতিবার ঈদের নামাজ আদায় করা হবে।
মসজিদ কমিটির এক সদস্য নির্দেশনামূলক সুরে বলছেন, অনুগ্রহ করে কেউ মসজিদের গেটের বাইরে ভিড় করবেন না। মসজিদ পূর্ণ হয়ে গেলে পরবর্তী জামায়াতের জন্য অপেক্ষা করুন। কোনো তর্কে জড়াবেন না। কোনো ভিডিও করবেন না। কোনো উস্কানিতে সাড়া দেবেন না।
শ্রোতাদের মধ্যে থাকা পুরুষরা নীরবে মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছেন। কেউ কেউ নিজেদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে চোখ বুলাচ্ছেন, যেখানে স্থানীয় পুলিশের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়েছে, যাতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে মুসলমানরা যেন রাস্তায় বা খোলা জায়গায় নামাজ আদায় না করেন। উপস্থিত অনেকের চোখেই স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ।
মালিয়ানার একটি রক্তাক্ত ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৭ সালের মে মাসে এখানে একদল স্থানীয় হিন্দু দাঙ্গাকারী এবং উত্তর প্রদেশ রাজ্য সরকারের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ‘প্রাদেশিক আর্মড কনস্ট্যাবুলারি’র (পিএসি) সদস্যদের হাতে ৭২ জন মুসলমান নির্মমভাবে গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন।
দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে শুনানি চলার পর, ২০২৩ সালে একটি জেলা আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্ত ডজন ডজন আসামিকে খালাস দেয়। তবে আজ এই মসজিদের কমিটি এবং মুসল্লিদের ঈদের পরিকল্পনা পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করার পেছনে যে ভয় কাজ করছে, তা একেবারে সাম্প্রতিক।

‘মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কের মধ্যে আছে’
২০১৪ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো আরও বেশি প্রশ্রয় ও সাহস পেয়েছে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা ট্রাফিক জ্যাম এবং নিরাপত্তার অজুহাত তুলে মুসলমানদের জুমার নামাজ ও ঈদের মতো ধর্মীয় উৎসবে খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করে আসছে।
এই গোষ্ঠীগুলো, এমনকি মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজীতিবিদরা রাস্তা, পার্ক বা খালি জায়গায় নামাজ আদায়ে বাধা সৃষ্টি করেছেন। খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করা হয়েছে এবং অনলাইন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে অনেক জায়গায় আগে থেকে পাওয়া নামাজের অনুমতিও বাতিল করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে, বিজেপির আদর্শিক মিত্র এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ (ভিএইচপি) দেশব্যাপী রাস্তার ওপর নামাজ পড়ার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছে। তারা এই ধর্মীয় রীতিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের ‘শক্তি প্রদর্শন’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
তবে মুসলমানরা যুক্তি দিচ্ছেন যে, প্রকাশ্য স্থানে নামাজ পড়ার ওপর এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা একটি বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ আড়চোখে দেখছে, তা হলো, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে জুমার নামাজ বা ঈদের মতো বিশাল জনসমাবেশে সব মুসল্লিদের জায়গা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা স্থানীয় মসজিদ বা নির্দিষ্ট ঈদগাহগুলোর নেই।
পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগের দিন ভারতের মুসলমানদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কি কোনো ধরণের হেনস্থা, সংঘাত বা সামাজিক বৈরিতার মুখোমুখি না হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ আদায় করতে পারবেন? বিশেষ করে বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশে এই উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি, যা জনসংখ্যার দিক থেকে প্রতিবেশী পাকিস্তানের মতোই বিশাল এবং যেখানে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মুসলমানের বসবাস (যা সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি)।
২০১৭ সাল থেকে উত্তর প্রদেশের ক্ষমতায় রয়েছেন কট্টরপন্থী হিন্দু যোগী আদিত্যনাথ। গেরুয়া বসনধারী এই সন্ন্যাসী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সবসময় কড়া ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যের জন্য পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার রাস্তা এবং খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার ওপর কড়াকড়ি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত ১৮ মে আদিত্যনাথ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে পোস্ট করে জানান যে, মুসলমানদের শিফটে বা দফায় দফায় ঈদের নামাজ আদায় করা উচিত। তিনি লিখেন, ভালোবাসায় মানলে ভালো, না মানলে অন্য পথ অবলম্বন করা হবে...।
উত্তর প্রদেশের মুসলমানদের কাছে আদিত্যনাথের এই অন্য পথ- এর হুমকি একেবারেই অপরিচিত বা নতুন কিছু নয়। মিরাটের এক মুসলিম ব্যক্তি নিজের নাম গোপন রাখার শর্তে আল জাজিরাকে বলেন, "গত বছর খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার অপরাধে মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছিল। কিছু কিছু জায়গায় ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন বাতিল করার খবরও পাওয়া গেছে। এসব দেখার পর মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
নয়াদিল্লি থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে আলীগড় জেলার একজন দোকানদার আরিফ মালিক জানান, গত বছরের ঈদুল আজহায় তাঁর এলাকার মুসলমানরা একটি খোলা মাঠে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য নামাজ পড়েছিলেন, কিন্তু নামাজ শেষ হতেই পুলিশ মুসল্লিদের তাড়া করে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, "এই ঈদে পরিবারের সদস্যরা সবাইকে যেকোনো ধরণের ভিড় বা জমায়েত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন।

‘আগে ঈদের সকাল মানেই ছিল আনন্দ’
উত্তর প্রদেশের মুসলমানরা বলছেন যে, ঈদের নামাজের ওপর এই ধরণের বিধিনিষেধ এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে সাধারণ ও নিয়মিত ধর্মীয় সমাবেশকেও এক ধরণের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজ্যের বেশ কয়েকটি শহরের মসজিদ কমিটিগুলো অত্যন্ত গোপনে ও নিঃশব্দে ঈদের জামায়াতের প্রস্তুতি নতুন করে সাজাচ্ছে। কোনো কোনো কমিটি জামায়াতের আকার ছোট করে আনছে, আবার কেউ কেউ মুসল্লিদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আসার এবং নামাজ শেষেই দ্রুত স্থান ত্যাগ করার অনুরোধ জানাচ্ছেন। মসজিদের স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যেন কেউ অসাবধানতাবশত বা সাময়িকভাবেও পাশের রাস্তায় গিয়ে না দাঁড়ান।
মিরাটের ৪২ বছর বয়সী মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আরিফ, যিনি গত দুই দশক ধরে ঈদের জামায়াতের আয়োজন করে আসছেন, তিনি বলেন, এখন অনেক মুসলমানের কাছে মূল চিন্তা শুধু এটা নয় যে নামাজ কোথায় পড়া হবে, বরং মূল চিন্তা হলো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে আমাদের এই প্রকাশ্যে সমবেত হওয়াটাকেই দিন দিন সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
আরিফ জানান, উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন শহরের মসজিদ কমিটিগুলো প্রশাসনের সাথে সংঘাত এড়াতে এবং ভিড় সামলাতে দফায় দফায় বৈঠক করেছে। তিনি যোগ করেন, মানুষ এখন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভাবছে তারা কীভাবে যাতায়াত করবে এবং কোথায় জায়নামাজ পাতবে।
মিরাটের ৩৩ বছর বয়সী দোকানদার আরশাদ নিজের ক্ষোভ ও ভীতি প্রকাশ করে আল জাজিরাকে বলেন, আমরা একটা ছোট ভুল করতেও ভয় পাচ্ছি। আগে ঈদের সকাল মানেই ছিল এক বুক আনন্দ। আর এখন ঈদের আগের রাত থেকেই এক চরম উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠা কাজ করে। মানুষ সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে এই বুঝি পুলিশ এলো, বা কেউ লুকিয়ে ভিডিও করে অনলাইনে ছেড়ে দিল।
অনেক মুসলমানের জন্য এই ধরণের বিধিনিষেধ ও লক্ষ্যবস্তু বানানোর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব শুধু নামাজ পড়ার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর চেয়েও গভীর। ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ছাত্র নোমান খান আল জাজিরাকে বলেন, এখানে একটা চরম অবমাননা ও অপমানের ভয় কাজ করে।
এমনকি শারীরিকভাবে কোনো ক্ষতি না হলেও, মানুষ ভয় পায় যে কেউ হয়তো তাদের ভিডিও রেকর্ড করে অনলাইনে ট্রোল করবে বা কোনো মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেবে। অভিভাবকরা এখন যুবকদের মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে নিষেধ করেন, কারণ কেউ কোনো ঝামেলা চায় না।
এই ভয় উৎসবের দিনগুলোতে মুসলিম সম্প্রদায়ের আচরণে সূক্ষ্ম কিন্তু স্পষ্ট পরিবর্তন এনেছে। যেকোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে মসজিদ কমিটিগুলো এখন ঈদের আগেই সরাসরি স্থানীয় পুলিশের সাথে সমন্বয় করছে। স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে প্রবেশপথগুলো পর্যবেক্ষণ করতে, ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নামাজ শেষ হওয়ামাত্রই যেন সবাই দ্রুত চলে যান তা নিশ্চিত করতে।
পশ্চিম উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার একজন ইমাম এই প্রস্তুতিকে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, আমরা এখন ঈদের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনার চেয়ে প্রশাসনের বিধিনিষেধ নিয়ে বেশি সময় নষ্ট করি। যেকোনো ধরণের বিতর্ক এড়িয়ে চলাই এখন আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
রাজ্যের রাজধানী লখনউয়ের আরেকজন ইমাম আল জাজিরাকে বলেন, জায়গার সংকটের কারণে ঈদের মূল জামায়াত স্বাভাবিকভাবেই সামান্য সময়ের জন্য পাশের রাস্তায় গিয়ে পৌঁছায়, এটি কোনো আইন অমান্যের জেদ থেকে করা হয় না। তিনি বলেন, নামাজ মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য হয় এবং এর পরপরই রাস্তা খুলে দেওয়া হয়। আগে এটাকে কখনোই বড় কোনো সমস্যা মনে করা হতো না। কিন্তু এখন এটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন মুসলমানরা জনসাধারণের জায়গা দখল করার চেষ্টা করছে।
এই উদ্বেগ শুধু উত্তর প্রদেশেই সীমাবদ্ধ নয়; দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য বিজেপি-নিয়ন্ত্রিত বা তাদের প্রভাব থাকা এলাকাগুলোতেও একই ধরণের সতর্কতামূলক পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

‘কেউ সংঘাত চায় না’
দিল্লির মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোর বাসিন্দারাও ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের ক্ষেত্রে এক ধরণের বাড়তি সতর্কতা ও জড়তার কথা জানিয়েছেন। এই প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া অনেক মুসলমান বলেছেন যে, তারা এখন নামাজের জন্য কোথায় দাঁড়াবেন, মসজিদের বাইরে কতক্ষণ থাকবেন এবং তাদের এই জমায়েত কোনো আইনি অভিযোগ বা অনলাইন ক্ষোভের জন্ম দেবে কি না, তা নিয়ে তাদের দুবার ভাবতে হচ্ছে। জাতীয় রাজধানীর ঐতিহাসিক মুঘল আমলের জামা মসজিদের বাইরে ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা জানান, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে কাপড়ের দোকান, সবখানেই এখন আলোচনার মূল বিষয় এই নামাজের বিধিনিষেধ। ২৪ বছর বয়সী পোশাক বিক্রেতা দানিশ খান আল জাজিরাকে বলেন, কেউ কোনো ঝামেলা বা সংঘাত চায় না। মানুষ শুধু শান্তিতে নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরতে চায়। কিন্তু এখন প্রতিটি ঈদ আসার আগেই এক অজানা আশঙ্কা তৈরি হয় যে প্রশাসন আবার কোনো নতুন নিয়ম জারি করে কি না।
এত উদ্বেগ আর আশঙ্কার মধ্যেও ঈদের প্রস্তুতি কিন্তু থেমে নেই। গভীর রাত পর্যন্ত বাজারে মানুষের উপচে পড়া ভিড়, দর্জি পাড়ায় পোশাক তৈরির ব্যস্ততা, নতুন জুতো আর মিষ্টির জন্য শিশুদের বায়না, সবই চলছে চিরচেনা ছন্দে। মসজিদের ভেতরে স্বেচ্ছাসেবকরা কার্পেট পরিষ্কার করছেন, ঈদের সকালের ভিড়ের জন্য পানির ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু এই চিরচেনা উৎসবের ছন্দের ঠিক নিচেই খেলা করছে এক গভীর ও অদৃশ্য অস্বস্তি।
উদ্বেগ শুধু ঈদের নামাজ নিয়ে নয়; ঈদুল আজহার প্রধান অনুসঙ্গ পশুকোর্বানির ওপরও এখন প্রশাসনের কড়া নজরদারি ও কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। কোরবানির পশুর রক্ত বা বর্জ্য যদি ভুলবশতও পাবলিক ড্রেন বা রাস্তায় যায়, তবে তার জন্য কঠোর আইনি পরিণতির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
আর এই সবকিছু এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ভারতীয় টেলিভিশন টকশো এবং সামাজিক মাধ্যমে মুসলিম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে প্রতিনিয়ত বিদ্বেষমূলক ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে; যেখানে মুসলমানদের যেকোনো ধরণের ধর্মীয় আত্মপ্রকাশকে নিরাপত্তা, বৈধতা বা জনসংখ্যার ভারসাম্যের অজুহাতে নেতিবাচক আলোয় বিচার করা হচ্ছে।
আল জাজিরার সাথে আলাপকালে বেশ কয়েকজন মুসলমান বলেন, হিজাব পরা, হালাল খাবার খাওয়া কিংবা লাউডস্পিকারে আজান দেওয়া নিয়ে একের পর এক তৈরি হওয়া বিতর্ক মুসলিম সম্প্রদায়ের মনের ভেতর এক দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্বলতার জন্ম দিয়েছে।
নয়ডার একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ফয়সান আলী বলেন, আপনার মনে হতে শুরু করবে যে আপনার পরিচয়ের সাথে যুক্ত প্রতিটি জিনিসই এখন প্রশ্নের মুখে। এমনকি শান্তিতে নামাজ পড়াটাও এখন এমন একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যা করার আগে আপনাকে দুবার ভাবতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন যে, জনসমক্ষে মুসলমানদের নামাজ পড়া নিয়ে এই বিতর্ক সমসাময়িক ভারতের এক বৃহত্তর রূপান্তরকে প্রতিফলিত করে, যেখানে মুসলমানদের প্রকাশ্য উপস্থিতি বা দৃশ্যমানতাকেই একটি বিতর্কের বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। ধর্ম ও পাবলিক স্পেস নিয়ে কাজ করা গবেষক ও সমাজকর্মী নাদিম খান আল জাজিরাকে বলেন, যখন একটি সম্প্রদায় তাদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসবে নামাজের জন্য প্রকাশ্যে সমবেত হতেও ভয় পায়, তখন তা স্পষ্ট করে দেয় যে ভারতের পাবলিক স্পেস বা জনসাধারণের জায়গাগুলো আজ কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এবং কারা সেখানে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিদার মনে করছে।

আইনের পক্ষপাতমূলক প্রয়োগ
সরকারি পক্ষ থেকে মুসলমানদের উৎসবের ওপর এই ধরণের বিধিনিষেধকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দোহাই দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, এর ঠিক বিপরীত চিত্রও দেখা যায়। অন্য প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিশাল ধর্মীয় মিছিল ও উৎসবগুলোর জন্য সরকার শুধু অনুমতিই দেয় না, বরং ট্রাফিক রুট পরিবর্তন, বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তা এবং সরকারি অবকাঠামোগত সব ধরণের সুবিধাও নিশ্চিত করে। ফলে সমালোচকরা এবং সাধারণ মুসলমানরা প্রশাসনের এই দ্বিমুখী নীতিকে আইনের স্পষ্ট পক্ষপাতমূলক প্রয়োগ হিসেবে দেখছেন।
নয়াদিল্লিভিত্তিক একজন আইনজীবী নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে (সরকারের কোপানলে পড়ার ভয়ে) আল জাজিরাকে বলেন, সাধারণ মানুষ শুধু এই বিধিনিষেধই দেখছে না, বরং তারা দেখছে আইনের এই অসম ও বৈষম্যমূলক প্রয়োগ। ভারতের সংবিধান জনশৃঙ্খলার অধীন থেকে সবাইকে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু যদি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে বারবার কঠোর নজরদারির মধ্যে পড়তে হয় এবং অন্য সম্প্রদায়কে সব ধরণের সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়, তবে আইনের চোখে সমতার নীতিটি বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে পড়ে।
খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার এই বিষয়টি এখন আরও বেশি স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে কারণ এই বিধিনিষেধের সাথে এখন যুক্ত হয়েছে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। গত এক দশকে বিজেপি শাসিত বেশ কয়েকটি রাজ্যে অনুমতি ছাড়া খোলা জায়গায় নামাজ পড়ার অভিযোগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে, যারা এই নামাজের আয়োজন করেছিলেন, তাদের বাড়িঘর বা সম্পত্তিকে অবৈধ ঘোষণা করে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধরণের পদক্ষেপ অত্যন্ত অতিরিক্ত এবং বৈষম্যমূলক, যা একটি সাধারণ ধর্মীয় উপাসনাকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করে দিচ্ছে। নয়াদিল্লির সমাজবিজ্ঞানী আজহার আহমদ খান বলেন, "পাবলিক স্পেস বা জনসাধারণের জায়গা শুধু কোনো ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি প্রতীকীও বটে। নামাজ নিয়ে এই যে বিতর্ক, তা আসলে দিনশেষে এই লড়াইয়ের বহিঃপ্রকাশ যে, সমসাময়িক ভারতে কারা নিজেদের দৃশ্যমানতা, বৈধতা এবং এই দেশের মূল অংশীদার হিসেবে ভাবার অধিকার রাখে।
