আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাঝেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলায় কেন্দ্রটির সীমানার বাইরে একটি অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হলেও বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা তেজস্ক্রিয়তার বিপর্যয় ঘটেনি। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আবুধাবি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রোববার আল ধাফরা অঞ্চলে অবস্থিত বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরের সীমানার ঠিক বাইরে একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে ড্রোন আঘাত হানলে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আবুধাবি মিডিয়া অফিস এবং ফেডারেল অথরিটি ফর নিউক্লিয়ার রেগুলেশন (এফএএনআর) নিশ্চিত করেছে যে, এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং এলাকার তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।

আরব উপদ্বীপের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি এবং এর সব ইউনিট বর্তমানে স্বাভাবিকভাবেই সচল রয়েছে। ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করা এই কেন্দ্রটি ২০২৪ সাল নাগাদ দেশটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার এক-চতুর্থাংশ পূরণ করে আসছিল। এটি সৌদি আরব ও কাতারের সীমান্তের কাছাকাছি, রাজধানী আবুধাবি থেকে প্রায় ২০০-২২৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত।
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী তিনটি ড্রোনের মধ্যে দুটিকে সফলভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও তৃতীয় ড্রোনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছের জেনারেটরে আঘাত হানে। ড্রোনগুলো 'পশ্চিম সীমান্ত' থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল বলে জানানো হলেও, হামলার উৎসের সন্ধানে বর্তমানে তদন্ত চলছে। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পক্ষ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ড্রোন হামলার পর উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি রিয়্যাক্টরকে সাময়িকভাবে জরুরি ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। আইএইএ’র প্রধান রাফায়েল গ্রোসি এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানান এবং সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনাকে হুমকিতে ফেলা যে কোনো সামরিক তৎপরতা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তীব্র সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ইরান অভিযোগ করে আসছে, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অভিযোগ তীব্রভাবে অস্বীকার করেছে।

পরবর্তীতে গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হলেও ড্রোনের মাধ্যমে বিক্ষিপ্ত হামলা বন্ধ হয়নি। গত সপ্তাহেও আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর নগরীতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে একটি তেল স্থাপনায় আগুন লাগে এবং তিনজন ভারতীয় নাগরিক আহত হন। সেই হামলার জন্যও আমিরাত ইরানকে দায়ী করেছিল। ইরান আগেই সতর্ক করেছিল, যেসব দেশ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা ইসরায়েলি স্বার্থকে আশ্রয় দেবে, তারা ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
সম্প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি যুদ্ধের সময় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গোপনে আমিরাত সফর করেছেন বলেও খবর রটে, যা আমিরাত কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করেছে। এদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি গত সপ্তাহে জানিয়েছেন যে, ইরানের সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করতে ইসরাইল ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের ‘আয়রন ডোম’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কর্মী মোতায়েন করেছে।
আমিরাতের ভূখণ্ডে হামলার ন্যায্যতা প্রমাণে ইরানের যে কোনো প্রচেষ্টাকে গত শুক্রবার আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে কোনো হুমকির জবাব দেয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
