মিরপুর কমার্স কলেজ থেকে কিছুটা এগিয়ে সরু গলি। গলির মাথায় দোতলা টিনের ঘর। সেখানে ছোট ছোট কামড়াগুলোর ভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। এমনই একটি ঘরে থাকেন মরজিনা বেগম। তিনি গত একবছর ধরে রিকশা চালান। স্বামী মোহাম্মদ শাহজাহানের হাত নেই আর শাশুড়ি নুরজাহানের নেই পা, হাতও ভাঙা। ছেলে আর পঙ্গু শাশুড়ি, স্বামীকে নিয়েই মরজিনার সংসার।
মিরপুর চিড়িয়াখানায় তার সাথে দেখা হয় প্রতিবেদকের। তারপর আস্তে আস্তে মরজিনা বলতে থাকেন তার দুঃখ, দুর্দশার কথা।
মরজিনা জানান, তার বিয়ে হয়েছিলো ১৫ বছর আগে। স্বামী সে সময় ব্যবসা করতেন। এক সড়ক দুর্ঘটনায় হাত ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ঘরে বসা। তাই বাধ্য হয়েই সংসারের হাল কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে। কোমরে সমস্যা থাকলেও এখন ভাড়ার রিকশা চালিয়েই সংসার চলছে।
যে ঘরটায় মরজিনা থাকেন তার ভাড়া তিন হাজার ৮০০ টাকা। গত তিনমাস ধরে তিনি তা পরিশোধ করতে পারেননি। সে কথা স্মরণ করে বলেন, ‘ভাড়ার জন্য মালিক কতো কথা কয়। বাসা ছাড়তে বলে। বাসা ছাড়লে, আমি এখন এই তিনজন লোক নিয়ে কই যামু!’
‘গত ১২ দিন ধইরা গাড়ি (রিকশা) নিয়া বাইর হইতে পারি নাই। পা দিয়া ব্রেক চাপতে পারিনা। রকটা (শিরা) প্যাচ খাইসে। অপারেশন করার খরচ নাই আমার কাছে। ডাক্তার তো আর দেখবে না আমার টাকা-পয়সা আছে নাকি নাই। সে কতোগুলা ওষুধ দিয়া দিছে।’

ছেলের সাথে মরজিনা বেগম
কখনো বাবা-মাকে দেখেননি মরজিনা। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে। ছোট থেকে মানুষ হয়েছেন কমলাপুরের বস্তিতে। কখনো বোতল কুড়িয়েছেন, কখনো মালা বেঁচেছেন। সে কথা ভেবে বলেন, ‘আমার জীবনটাই কষ্টের, কখনো বাবা-মায়ের দেখা পাই নাই। আমি আমার বাবা-মায়ের ঘরের এক সন্তান। কোনো ভাই-বোনও নাই আমার। দুনিয়ায় এই তিনজন লোক ছাড়া কেউ নাই আমার।’
‘কারো কাছে আমি চাইতে পারিনা। লজ্জা করে। মাইনসে শুনি কতো কিছু পায়। আমারে কেউ কখনো কোনো সহায়তা করেনি। কোনো মেম্বরও খোঁজ নেয় নাই। শীতে একটা কম্বলও পাই নাই।’
ভাড়া রিকশা চালিয়ে দিনে অর্ধেকের বেশি টাকা জমা দিতে হয় মালিককে সে কথা উল্লেখ করে মরজিনা বলেন, ‘দিনে পাঁচশ’ থেকে ছয়শ’ টাকা কামাইতে পারলে মালিককে দিতে হয় তিনশ’ টাকা। বাকি টাকায় চাল-ডাল কেনা যায়। কিন্তু যেদিন বের হতে পারিনা তখন সমস্যা হয়। অনেক সময় নাও খাইয়া থাকতে হয়। বাচ্চাটা ছোটো, ওর মুখে যদি খাবার দিতে না পারি নিজেরে বড় অপরাধী লাগে।’
আরও পড়ুন: চাকরি হারিয়ে সুরের ফেরিওয়ালা মামুন
কথা হয় মরজিনার স্বামী মোহাম্মদ শাহজাহানের সঙ্গে। বর্তমানে তিনিই একহাতে ঘরের কাজ করেন। মরজিনা যখন রিকশা নিয়ে বের হন, তখন পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করেন শাহজাহান।
সংসারের জন্য স্ত্রীর রিকশা চালাতে হয়, বিষয়টি তিনি কিভাবে দেখেন এমন প্রশ্নের জবাবে শাহজাহান বলেন, ‘কি করার আছে? সবটাই তো নিয়তি। হাত ভালো থাকলে তো আমি কাজ কর্ম করতামই। খাওয়া তো লাগবে। সে ঘরে বসে থাকলে আমরা তো না খাইয়া মইরা যামু। কে আমাদের খাবার দিবে? কেউ তো খোঁজ-খবর নেয় না কোনোদিন।’

শাশুড়ি ও ছেলের সাথে মরজিনা বেগম
তিনি জানান, ১৯৭৪ সাল থেকে মাকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। শুরুতে টোকাইয়ের কাজ করতেন। পরে কমলাপুরে দোকান নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে ভাত এবং পরে বিরিয়ানির দোকান দেন। এরপর মিরপুরে এসে দোকান দেন। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় হাত হারিয়ে এখন পঙ্গু। মা ছেলে একই বাসের নিচে পড়ে হারান হাত-পা।
মরজিনার শাশুড়ি নুরজাহান বেগম সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছেন বছর ১০ আগে। এরপর গত ৩ বছর আগে পুনরায় দুর্ঘটনায় তার হাতও ভেঙে যায়। দুই লাঠিতে ভর দিয়ে কোনো ক্রমে তিনি হাঁটতে পারেন। রাজধানীর চিড়িয়াখানা এলাকায় কখনও কখনও তিনি ভিক্ষাও করেন। দিনে এক থেকে দেড়শ’ টাকা মেলে তাতে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘যখন অ্যাক্সিডেন্ট করছিলাম- ডাক্তার কইছিলো পা কাইটা ফালাইতে। পা কাটলে খারাপ দেখা যাইবো দেইখা পোলায় কইছে পা কাটা লাগবে না। এরপর আবার বাসের তলে পইড়া হাত গেছে।’
‘সে সময় যখন অ্যাক্সিডেন্ট হয়, আমারে গাড়ি মাইরা গেছে গা। পরে এক দারোগায় আমারে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়া যায়। সেখানে কাটা কোনোমতে সেলাই কইরা দিছে।’
আরও পড়ুন: হাত ছাড়া জন্মেও থামতে শেখেননি হেলাল

মরজিনা বেগম
নুরজাহান বলেন, আমি ছিলাম আমার বাবার এক মেয়ে। আমার ছেলেও একা। আমার বাবা আমাদের জন্য কিছু রেখে যায়নি। আমিও ছেলেকে কিছু দিতে পারলাম না। সেই ৭৪ সালে ঢাকা আসার পর আর কখনো বাড়িতে যাওয়া হয়নি। সেখানে আমাদের কেউ নেই। দুনিয়াতেও আমাদের কেউ নেই।
পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলা প্রায় শেষ, এবার বিদায় নেওয়ার পালা। এসময় মরজিনা বলেন, ‘আমার যদি একটা ঘরও থাকতো, তাও চলতে পারতাম। আমি জায়গাটাতে থাইকা, চাইয়া হইলেও দুইটা ভাত খাইতে পারতাম।’
একাত্তর/আরএ
