আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী। রাজস্ব আয়ে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার ৮৭ শতাংশই আদায় করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
এবারও ঘাটতি মোকাবেলাসহ বাজেট বাস্তবায়ন ও রাজস্ব আয়ের নতুন কোনো দিক নির্দেশনা নেই বাজেটে। আছে ৬ দশমিক সাত পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের চ্যালেঞ্জও।
মূল্যস্ফীতি, বিশ্ব অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতি, দেশের ব্যাংক খাতে চড়া সুদ ও ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের দরপতন; এতোসব চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল হাসান মাহমুদ আলীর এটি প্রথম বাজেট।
‘সুখী সমৃদ্ধ উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের অঙ্গীকার’ এই বাজেটের মূলনীতি। আকার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। উন্নয়ন বাজেট ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারের ১৩ লক্ষাধিক চাকরিজীবীর বেতনভাতা, পেনশন ও অফিস পরিচালন খাতে খরচ ৫ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে সুদ পরিশোধে। যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ২ শতাংশ।
জনপ্রশাসন খাতে ২২ দশমিক ১ শতাংশ, শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে ১৪ শতাংশ, পরিবহণে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ, কৃষি ৫.৯ এবং স্বাস্থ্যে ৫.২ শতাংশ বরাদ্দ রেখেছেন অর্থমন্ত্রী।
তবে খরচ করার ইচ্ছা নির্ভর করবে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটির রাজস্ব আদায়ের ওপর। এরমধ্যে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা আদায় করবে এনবিআর।
রাজস্ব বোর্ডের বাইরে কর ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, কর বহির্ভুত ফি ও জরিমানা থেকে ৪৬ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে চান অর্থমন্ত্রী।
করমুক্ত আয়সীমা আগের মতোই সাড়ে তিন লাখ টাকা। তবে ধনীদের ওপর কর ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
এতো হিসাব নিকাশের পরও অর্থমন্ত্রীকে ধার করতে হবে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে ব্যাংক থেকে নেবেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর বিদেশী ঋণ নেবেন ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

১৫ শতাংশ জরিমানা দিলেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে এবারও।
এদিকে প্রতিবারের মতো বাজেট গণমুখী বলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি বলছে ‘লুট করার’ বাজেট।
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে সংকটের সময়ে বাস্তবসম্মত ও গণমুখী বাজেট বলে অভিহিত করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, কারো প্রেসক্রিপশন মেনে বাজেট প্রণয়ন করা হয়নি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই বাজেট লুটেরাদের বাজেট। লুটপাট করতেই বাজেট দেয়া হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট লুটেরাদের শুধু নয়, গণবিরোধী এবং দেশ বিরোধী বাজেট।
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটকে গতানুগতিক বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) । সংস্থাটি বলছে, বাজেটে রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে না সরকার।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বেশি নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। আর প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি, মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রার সাথেও বাস্তব সূচকের কোনো মিল নেই।
তিনি বলেন, উদ্ভাবনী ও সাহসী পদক্ষেপ বাজেটে নেই, এটা গতানুগতিক বাজেট। মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে এক বছরের মধ্যে সাড়ে ছয় শতাংশে নামিয়ে আনাটাও চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি কমানো নিয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দুঃখজনক ও গ্রহণযোগ্য নয়।
এসব সমালোচনার থাকলেও বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।
সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রমে বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় আসন্ন অর্থবছরে ৯ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, মা ও শিশু বিভাগে সেবাগ্রহীতার সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষায় হিজরা সেবাগ্রহীতার সংখ্যাও দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বাজেট বক্তৃতায়। এতে বলা হয়, উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ হচ্ছে বিদ্যুৎ। তবে আগের বছরের তুলনায় এবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ কমেছে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যেও এবার বরাদ্দে পিছিয়ে আছে জ্বালানি খাত। এ খাতে এবার এক হাজার ৮৭ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। আর বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ২৯ হাজার ২৩০ কোটি টাকা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব?
ঋণের সুদের পেছনে ব্যয় এক লাখ কোটি টাকা ছাড়াচ্ছে