আওরঙ্গজেবকে নিয়ে যে কারণে উত্তপ্ত ভারতের রাজনীতি

আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ০৪:২৯ পিএম

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব মারা গেছেন তিনশ' বছরেরও বেশি সময় আগে। তবে তাকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ভারত। 

আওরঙ্গজেবকে বলা হয় ভারতের 'শেষ কার্যকর মুঘল সম্রাট'। ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ বছর শাসন করলেও, ইতিহাসবিদদের কাছে তিনি কখনোই খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। 

প্রথমত এর কারণ হলো, তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন নিজের বাবাকে বন্দি ও বড় ভাইকে হত্যা করে। আর অন্যান্য মুঘল শাসকদের তুলনায় তার খুব একটা সুনাম ছিল না। 

আওরঙ্গজেবের প্রপিতামহ আকবরকে বলা হতো ধর্মনিরপেক্ষ ও সদয় শাসক, পিতামহ জাহাঙ্গীর পরিচিত ছিলেন শিল্প ও স্থাপত্যকলার প্রতি তার ভালোবাসার জন্য, আর পিতা শাহজাহান ছিলেন একজন রোম্যান্টিক ও তাজমহলের নির্মাতা। 

এদিকে ষষ্ঠ মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান, যাকে প্রায় সময়ই নির্দয় অত্যাচারী শাসক হিসেবে দেখা হতো। সাম্রাজ্য বিস্তারকারী আওরঙ্গজেব কঠোর শরিয়া আইন প্রচলন করেন এবং হিন্দু প্রজাদের জন্য বৈষম্যমূলক জিজিয়া কর ফিরিয়ে আনেন, যা তাদেরকে নিরাপত্তার জন্য প্রদান করতে হতো।

তার সম্পর্কে আরও বলা হয়, তিনি সঙ্গীত এবং অন্যান্য শিল্পকলাকে ঘৃণা করতেন এবং তিনি বেশ কয়েকটি মন্দির ধ্বংস করে ফেলারও নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ সবকিছুই কয়েকশ' বছর আগের ঘটনা হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি নজিরবিহীন ঘৃণার শিকার হচ্ছেন। আর এর শুরু হয় ভারতের জ্ঞানব্যাপী মসজিদ নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর। 

বারানসি শহরের এই মসজিদটি একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মাণ করা হয়। ১৬৬৯ সালে বিশ্বনাথ মন্দির ধ্বংস করে সেখানে এই মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব। 

এখন আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মর্যাদাহানিকর রেফারেন্স দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। এমনকি আদালতের নথিতেও এসব রেফারেন্স পাওয়া যাচ্ছে এবং এগুলো তুলে ধরছেন ভারতের হিন্দুত্ববাদী নেতারা। 

গত ডিসেম্বরে বারানসিতে দেয়া এক বক্তৃতায় 'আওরঙ্গজেবের নৃশংসতা ও সন্ত্রাসের' ব্যাপারে বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, 'আওরঙ্গজেব তরবারির সাহায্যে সভ্যতাকে পাল্টাতে চেয়েছিলেন। গোঁড়ামির মাধ্যমে তিনি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে চেষ্টা করেছেন।' 

গত মাসে শিখ গুরু তেগ বাহাদুরের ৪০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি আবারও এই মুঘল সম্রাটের নাম উল্লেখ করেন। ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে অস্বীকার করায় তেগ বাহাদুরের শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল।

মোদি বলেন, 'যদিও আওরঙ্গজেব অনেকের মস্তক বিচ্ছিন্ন করেছেন, তিনি আমাদের বিশ্বাসে নাড়া দিতে পারেন নি।' 

তার এ বক্তব্যে ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলেন কানাডীয়-আমেরিকান সাংবাদিক ডেভিড ফ্রুম। তিনশ' বছর আগে মারা যাওয়া এক মুঘল সম্রাটকে আক্রমণ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কেন লম্বা বক্তৃতা দিচ্ছেন, এক টুইটবার্তায় তা জানতে চান ফ্রুম। 

ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রাশকি এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা বিশ্বাস করেন যে মুসলমানরা কয়েকশ' বছর ধরে হিন্দুদের নির্যাতন করেছে, সুতরাং তার শাস্তি হিসেবে এখন মুসলমানদেরকে নির্যাতন করতে হবে। 

তার মতে, মুসলমানদেরকে ঘৃণা করা ও তাদের সাথে সহিংস আচরণ করাকে গ্রহণযোগ্য করতেই আওরঙ্গজেবের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। 

সম্প্রতি আওরঙ্গজেবকে 'কসাই' আখ্যা দিয়ে তার সব চিহ্ন মুছে ফেলার দাবি জানান আগ্রা শহরের মেয়র। টুইটারে মুঘল এই সম্রাটকে উল্লেখ করা হয়েছে একজন 'দখলদার' হিসেবে, যিনি হিন্দুদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে চেয়েছিলেন।

এমনকি, হিন্দু উপাসনাস্থলের ওপর মুসলমানরা যেসব স্থাপনা নির্মাণ করেছে তার সবগুলো বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়ার দাবি জানানো হয়। 

গত ১৯ মে মহারাষ্ট্রের এক আঞ্চলিক রাজনীতিবিদ আওরঙ্গজেবের সমাধির অস্তিত্ব ধরে রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর সেটি দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। ওই নেতা আওরঙ্গজেবের সমাধি ধ্বংস করে ফেলারও আহবান জানিয়েছেন।

image

মহারাষ্ট্রে আওরঙ্গজেবের সমাধি

ইতিহাসবিদ, লেখক এবং আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাদিম রেজাভি বলেন, ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘু যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিন্দু জনরোষে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, তাদেরকে খারাপ হিসেবে তুলে ধরতে আওরঙ্গজেব 'একটি সুবিধাজনক নামে' পরিণত হয়েছে।

অধ্যাপক রেজাভি বলেন, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব বেশ কিছু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন এবং হিন্দুদের ওপর বৈষম্যমূলক কর আরোপ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি ছিলেন জটিল একজন ব্যক্তি এবং তিনি পুরোপুরি শয়তান ছিলেন না।

'আওরঙ্গজেব হিন্দু মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সর্বোচ্চ পরিমাণে অনুদান দিয়েছেন, তার রক্তের দিক থেকেও তিনি নিজেও দুই-তৃতীয়াংশ হিন্দু ছিলেন কারণ তার প্রপিতামহ আকবর একজন রাজপুতকে (একটি হিন্দু সম্প্রদায়) বিয়ে করেছিলেন এবং তার শাসনামলে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের মধ্যে আরও অনেক রাজপুত ছিলেন', বলেন অধ্যাপক রেজাভি। 

আওরঙ্গজেব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা যাই হোক না কেন, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে মৌলবাদী ছিলেন না বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক রেজাভি। আওরঙ্গজেব মদ্যপান উপভোগ করতেন, বীণা বাজাতেন এবং অন্য যেকোনো মুঘল শাসকের সময়ের তুলনায় তার অধীনেই সঙ্গীতের ওপর অনেক বেশি বই রচিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আরও পড়ুন: তালেবান নির্দেশ মেনে মুখ ঢেকেই টিভির সামনে নারীরা

তবে, ভারতের বর্তমান নেতাদের মতো আওরঙ্গজেবও রাজনৈতিক ব্যর্থতা ধামাচাপা দিতে এবং কর্তৃত্ব জোরালো করতে ধর্মের আশ্রয় নিয়েছেন- যোগ করেন অধ্যাপক রেজাভি। 

'তবে প্রশ্ন হচ্ছে, আওরঙ্গজেব যদি খারাপ ও দুষ্ট প্রকৃতির হন, একজন সাম্প্রদায়িক এবং মৌলবাদী, যিনি মন্দির ধ্বংস করেছেন, আজকের দিনে কি আমাদেরকে তাকেও ছাড়িয়ে যেতে হবে?', বলেন তিনি। 

'তিনি একজন স্বৈরশাসক এবং সম্রাট ছিলেন যিনি তিনশ' বছর আগে বেঁচে ছিলেন। সেসময় আধুনিক গণতন্ত্র ছিল না, তাকে পরিচালনার জন্য কোন সংবিধান ছিল না। কিন্তু এখন আমাদের ভারতীয় সংবিধান আছে এবং পার্লামেন্টের আইন আছে, তাহলে যেসব কাজ ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে করা হয়েছে সেগুলো এখন আমরা কিভাবে পুনরাবৃত্তি করতে পারি?' প্রশ্ন করেন ড. রেজাভি।

কেউ যদি সপ্তদশ শতাব্দীর রাজনীতিকে আসকারা দেয়, তাহলে আওরঙ্গজেব সপ্তদশ শতাব্দীতে যেসব অপরাধ করেছিলেন, তারা এর চেয়েও বড় অপরাধ করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


একাত্তর/এসজে

বিয়ের সানাই বাজছিল ঠিকঠাক, কাজিও কবুল পড়িয়ে দিয়েছিলেন অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। কিন্তু আসল টুইস্টটা জমা ছিল দুপুরের খাবারের টেবিলের জন্য! পাতে খাসির মাংসের বদলে কেন মুরগির মাংস পরিবেশন করা...
ভারতের ছাত্র-যুবদের কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি এবার এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন রূপ নিল দিল্লির বুকে। সপ্তাহজুড়ে খবরের শিরোনামে থাকার পর, আজ শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে...
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখলেও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের আসল নজর এখন তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০ সদস্যের বিধায়ক দলের অন্দরে তৈরি হওয়া তীব্র ফাটলের...
‘সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত! চারদিকে শুধু ঘুষ আর অনিয়ম, আর সেই কারণেই আমি আজ আমার পরিবারের প্রায় সবাইকে হারালাম’; কান্না চেপে, তীব্র ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে কথাগুলো বলছিলেন বিষ্ণু কান্ত গর্গ। গত বুধবার...
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই স্নায়ুক্ষয়ী মহাকাব্যিক ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেওয়ার রাতে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মানের মুকুট মাথায় তুললেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে পুরো ম্যাচ জুড়ে বোতলবন্দি করে স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের রাতেই টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষকের মুকুট মাথায় তুলেছেন উনাই সিমন। পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষের...
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন চূর্ণ করে স্পেনের ট্রফি উদযাপনের রাতেই বিশ্বমঞ্চে রচিত হলো আরও এক সোনালী ইতিহাস। রোববারের সেই রক্তক্ষয়ী ফাইনালে আলবিসেলেস্তেদের ১-০ গোলে হারিয়ে...
নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘতম মহাযজ্ঞের অবসান ঘটল এক চরম নাট্যমঞ্চের মধ্য দিয়ে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে ১-০ গোলে গুঁড়িয়ে...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর