ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারে মার্কিন অভিযানের কয়েক মাস আগে থেকেই দেশটির কট্টরপন্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়োর সাথে মার্কিন কর্মকর্তাদের আলোচনা চলছিলো এবং অভিযানের পর থেকে এখনো তাদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ খবর দিয়েছে রয়টার্স।
সূত্রগুলো জানায়, ৬২ বছর বয়সী কাবেয়ো যেসব নিরাপত্তা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা যেন বিরোধীদের লক্ষ্যবস্তু না বানায়- সে বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা তাকে সতর্ক করেছেন। গত ৩ জানুয়ারির মার্কিন অভিযানের পরও গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনীসহ ভেনেজুয়েলার এই বিশাল নিরাপত্তা বলয় মূলত অক্ষত রয়েছে।
উল্লেখ্য, যে মাদক পাচার মামলার অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে গ্রেপ্তার করেছে, সেই একই মামলায় কাবেয়োর নামও রয়েছে। তবে অভিযানের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানায়, কাবেয়োর সাথে এই যোগাযোগ বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের শুরুর দিকে শুরু হয় এবং মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঠিক আগের সপ্তাহগুলোতেও তা অব্যাহত ছিল। আলোচনায় কাবেয়োর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং তার বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। মাদুরোর পতনের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্তও প্রশাসনের সাথে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে আরও চারটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এই প্রথম কাবেয়োর সাথে মার্কিন যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এলো, যা ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন উদ্বেগ সম্পর্কে অবহিত একটি সূত্রের মতে, কাবেয়ো যদি তার নিয়ন্ত্রিত বাহিনীগুলোকে লেলিয়ে দেন, তবে দেশটিতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, যা ট্রাম্প এড়াতে চান। পাশাপাশি এটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ক্ষমতার ভিতকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
তবে কাবেয়োর সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনায় ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে কথা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কাবেয়ো মার্কিন সতর্কবার্তায় কর্ণপাত করেছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জনসম্মুখে তিনি রদ্রিগেজের সাথে ঐক্যের অঙ্গীকার করেছেন, যা নিয়ে ট্রাম্পও প্রশংসা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র রদ্রিগেজকে মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলার জন্য তাদের কৌশলের মূল চাবিকাঠি মনে করলেও, কাবেয়োকে মনে করা হয় এমন এক শক্তি- যিনি মার্কিন এই পরিকল্পনাকে সফল করতে পারেন অথবা যে কোনো সময় তা নস্যাৎ করে দিতে পারেন।
মাদুরোর অনুগত কাবেয়ো দীর্ঘকাল ধরে ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং মাদুরোর একনিষ্ঠ অনুগত ছিলেন। বিরোধী দমনে মাদুরোর প্রধান অস্ত্র হিসেবে তাকে দেখা হতো। রদ্রিগেজ ও কাবেয়ো বছরের পর বছর সরকারের কেন্দ্রে থাকলেও তাদের মধ্যে কখনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তা কাবেয়োর প্রভাব রয়েছে দেশটির সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর। এছাড়া তিনি সরকার সমর্থক সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী ‘কোলেক্তিভো’র সাথেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
ওয়াশিংটন তেল সমৃদ্ধ এই দেশটির উত্তরণে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাবেয়োসহ হাতেগোনা কয়েকজন মাদুরো অনুগত ব্যক্তির ওপর সাময়িকভাবে নির্ভর করেছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের শঙ্কা, কাবেয়োর অতীত রেকর্ড এবং রদ্রিগেজের সাথে তার পুরোনো দ্বন্দ্ব যে কোনো সময় পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও আইনি অভিযোগ মাদক পাচারের অভিযোগে কাবেয়ো দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার মাথার দাম ১০ মিলিয়ন ডলার ঘোষণা করেছিল এবং ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামক মাদক পাচার চক্রের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে তাকে অভিযুক্ত করে।
বর্তমানে এই পুরস্কারের পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে। তবে কাবেয়ো বরাবরই মাদক পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হবার পর ওয়াশিংটনের অনেক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদ প্রশ্ন তুলেন, কেন কাবেয়োকে গ্রেপ্তার করা হলো না। গত ১১ জানুয়ারি রিপাবলিকান প্রতিনিধি মারিয়া এলভিরা সালাজার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, দিওসদাদো কাবেয়ো সম্ভবত মাদুরো বা ডেলসি রদ্রিগেজের চেয়েও বেশি ভয়ংকর।
মাদুরোর পতনের পরপরই কাবেয়ো মার্কিন হস্তক্ষেপের নিন্দা জানান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি বা চেকপোস্টের সংখ্যা কমেছে। ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাবেয়ো নিজেই এই প্রক্রিয়ার তদারকি করছেন। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই মুক্তি প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে।
ইরানের রাজপথ স্তিমিত হতেই ট্রাম্পের নরম সুর!
যুদ্ধোত্তর গাজা সামলাবে ট্রাম্পের বোর্ড, সদস্য হলেন ব্লেয়ার-রুবিও