কথা রাখলো দীপ্ত, ৯৭ দিন পর ফিরলো ঘরে

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:২৭ পিএম

অন্ধকারের পর যখন প্রথম আলো ফোটে, তখন মনে হয় জীবন নতুন করে শুরু করছে। কিন্তু রাজধানীর মাইলস্টোন ট্রাজিডির ভিকটিম নাভিদ নেওয়াজ দীপ্তর জন্য ৯৭ দিন ছিলো ঠিক সেই অন্ধকারের মতো- আগুনের লেলিহান শিখা, যন্ত্রণার চিৎকার এবং জীবন-মৃত্যুর সীমান্তে এক অদম্য লড়াই। তবে জীবনের নতুন আলো দেখেছে সে।

২১ জুলাইয়ের সেই ভয়াবহ দুপুর, যখন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে আছড়ে পড়ে, তখন শুধু একটি স্কুল ভবন ধ্বংস হয়নি; অগণিত স্বপ্নের ছাই হয়ে গেছে। ৩৫ জনের মৃত্যু, শতাধিক আহত - এর মধ্যে ছিলো সপ্তম শ্রেণির এই ছেলে, যার শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে যায় বন্ধুদের বাঁচাতে গিয়ে।

সোমবার (২৭ অক্টোবর) প্রায় তিন মাস পর, দীপ্ত ফিরছে বাড়ি। তার ছোট বোন নায়রা আফরিনের হাসি আর পোষা পাখিদের ডাকের কাছে। এটি শুধু একটি ছেলের গল্প নয়; এটি সাহস, ভালোবাসা এবং পুনর্জন্মের কাহিনী। যে কাহিনীর শিরোনাম দীপ্ত আগেই বাবাকে বলেগিয়েছিলো। সে বলেছিলো- ‘বাবা, আমিতো বন্ধুদের সাহায্য করেছি, নিশ্চয়ই বেঁচে যাবো।’

সেই দুপুরের ধ্বংসলীলা: স্বপ্নের স্কুলে আগুনের জ্বালা

উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছিল শত শত শিশুর স্বপ্নের আশ্রয়। ২১ জুলাই, দুপুর একটা ১০ মিনিটের দিকে স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠল ক্লাস শেষের সঙ্কেতে। গেটে অপেক্ষায় ছিলেন মায়েরা, যার মধ্যে একজন ছিলেন নুরুন নাহার — দীপ্তর মা। কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ হলো না কখনো। আকাশ থেকে নেমে এলো বিমানের ধ্বংস, আছড়ে পড়ল হায়দার আলী ভবনে। বিস্ফোরণ, আগুন, ধোঁয়া — সব মিলিয়ে এক অপ্রত্যাশিত নরক।

দুর্ঘটনার তদন্ত চলছে এখনও, কিন্তু প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, বিমানটি টেকঅফের পরপরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে ২৭ জন শিক্ষার্থী, কয়েকজন শিক্ষক এবং পাইলটসহ মোট ৩৫ জনের জীবন কেড়ে নেয় আগুন। শিক্ষিকা মেহরিন চৌধুরী, যিনি প্রাণ দিয়ে ২০ জনের বেসরকারি রক্ষা করেন, হয়ে ওঠেন এই ট্র্যাজেডির প্রতীক। 

দীপ্তর ক্লাসমেট মাকিন এবং আয়ান- তার ‘হরিহর আত্মা’- ছিলো টিচার্স রুমে আটকা। দীপ্ত তাদের বাঁচাতে ছুটে যায়, কিন্তু আগুন ছড়িয়ে পড়ে তার ছোট শরীরে। ‘না, আমার বন্ধুদের বের না করে যাবো না,’ — এই চিৎকার তার সাহসের সাক্ষ্য। শিক্ষক আনোয়ার তাকে গায়ের শার্ট খুলে বের করেন, কিন্তু ততক্ষণে তার শরীরের অর্ধেক পুড়ে গেছে। তবে মাকিন এবং আয়ান আর ফিরলোনা। 

আইসিইউর বিছানায় যুদ্ধ: ‘আমি তো মরবো না’

জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিউট- এখানে দীপ্তের যাত্রা শুরু হয় তিন নম্বর বেডে। শরীরের ৪৫ শতাংশ দগ্ধ, ইনহেলেশন ইনজুরি - চিকিৎসকরা বলেছিলেন, এমন কেসে বেঁচে থাকা ‘কিছুটা অলৌকিক’। লাইফ সাপোর্টে, যন্ত্রের শব্দের মধ্যে দীপ্ত লড়াই করে। এক হাত নড়ানোর ক্ষমতা রেখে সে মোনাজাত করে, বাবাকে বলে, ‘বাবা, তুমি আমার কেমন বাবা যে নিজের সন্তানকে একটু জড়িয়ে ধরতেও পারো না?’ বাবা মিজানুর রহমানের চোখে জল — ‘প্রতিটা মুহূর্ত একটা নতুন অভিজ্ঞতা। আমরা ফ্লোরে ঘুমাই, কিন্তু ছেলের জন্য সব সহ্য করি।’

দীপ্তর কথায় ভরা সেই দিনগুলো। আইসিইউ থেকে বাবা-মাকে বলে, ‘তোমাদের ছেড়ে যাবো না।’ বাবার রাগে পোষা পাখিগুলো ছাড়ার কথা শুনে আবদার করে যত্ন নেওয়ার। ছোট বোন নায়রাকে আর কখনও বকবে না- দেয় সেই প্রতিশ্রুতিও। ‘বন্ধুদের বাঁচাতে চেষ্টা করেছি, আমি তো মরবো না,’ — এই কথা তার অদম্য চেতনার প্রমাণ। 

মা নুরুন নাহার, যিনি দুর্ঘটনার দিন হন্যে হয়ে ছেলেকে খুঁজছিলেন, এখনও কথা বলার মতো অবস্থায় নেই তিনি। তিন তলায় বিশ্রাম নিচ্ছেন, কিন্তু ছেলের হাসির স্বপ্ন দেখেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, এটি এক যুদ্ধের বিজয়। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন জানান, দীপ্ত আমার সন্তানের মতো। এখানকার সব শিশু আমাদের সন্তান। চেষ্টা চলছে প্রাণপণে। পোড়া রোগীদের অবস্থা সময়ে পরিবর্তনশীল, কিন্তু দীপ্ত নানা পর্যায় পেরিয়ে এসেছে। এর মধ্যে ভারত ও সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা সাহায্য করেছেন। মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে আহত আরও ৩২ জনের মধ্যে তিন জন এখনও ক্রিটিক্যাল, কিন্তু ২৫ জন ইতিমধ্যে ছুটি পেয়েছেন।

ফিরে আসার আনন্দ: পাখি আর বোনের কোলে নতুন জীবন

আজ ১৩০১ নং কেবিন থেকে ছুটি মিললো দীপ্তর। হাসপাতালের কর্মীরা পরম মমতায় বিদায় জানালেন তাকে। বাড়ি ফিরছে সে নায়রার কাছে- যে বোন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে এবং যার পৃথিবী ছিলো বর্ণহীন ভাই ছাড়া। ‘ভাই বকলেও আর অভিযোগ করববো না,’ — নায়রার চোখে আনন্দের অশ্রু। দুই ভাইবোন আবার হাত ধরে স্কুলের আঙ্গিনায় পা রাখবে, স্বপ্ন বুনবে। পোষা পাখিগুলোর যত্ন নেবে দীপ্ত, যাদের জন্য সে মৃত্যুর দুয়ার থেকে আবদার করেছে।

বাবা মিজানুরের বুক জুড়োল আজ। বললেন, ‘ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে পারছি না এখনও, কিন্তু আজ হাত ধরতে পারলাম। দীপ্ত আমার মতোই বন্ধুভক্ত- জান দিয়ে সাহায্য করে। মামা-মামী, আত্মীয়-স্বজন, বাবার স্কুলবন্ধু আদনান-সোহাগ — সবাই পালা করে থেকেছে হাসপাতালে। পরিবার জাতীয় বার্ন হাসপাতাল, চিকিৎসক এবং দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ। এমন ট্র্যাজেডি আর না আসুক আমাদের জাতির জীবনে, — বলীছলেন মিজানুর।

ছাইয়ের মধ্যে আশার অঙ্কুর: একটি জাতির শিক্ষা

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত কমিটি এখনও রিপোর্ট জমা দেয়নি, কিন্তু এটি প্রকাশ করেছে যে ঢাকার উত্তরে বিমান প্রশিক্ষণের ঝুঁকি কতোটা। কিন্তু দীপ্তের মতো শিশুরা আমাদের শেখাচ্ছে — যন্ত্রণা যতোই গভীর হোক, ভালোবাসা এবং সাহসে ফিরে আসা যায়।

দীপ্ত ফিরছে না শুধু বাড়ি; সে ফিরছে এক নতুন জীবনের দরজায়। যেখানে মাকিন আর আয়ানের স্মৃতি থাকবে চিরকাল, কিন্তু স্বপ্নগুলো নতুন করে বুনবে। এই গল্পটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়: আগুন পুড়িয়ে দিতে পারে শরীর, কিন্তু আত্মা অটুট রাখে ভালোবাসা। দীপ্তকে সুস্থ জীবনের অঙ্কুরে শুভকামনা — এবং এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটুক।

একাত্তর/এসি
টাইমলাইন: উত্তরায় যুদ্ধ বিমান বিধ্বস্ত
২৭ অক্টোবর ২০২৫, ১৮:২৭
কথা রাখলো দীপ্ত, ৯৭ দিন পর ফিরলো ঘরে
শোক, আতঙ্ক আর গভীর বিষণ্নতায় ছেয়ে আছে উত্তরার মাইলস্টোন ক্যাম্পাস। শিশুরা চোখের সামনে বন্ধুদের ভয়াবহ মৃত্যু দেখেছে। নিজেও মুখোমুখি হয়েছে মারাত্মক বিপদের।
রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে আহত আরো দুই জনকে ছাড়পত্র দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এবার একসঙ্গেই বাড়ি ফিরলেন শিক্ষক ও ছাত্রী।
আকস্মিক ও  অনাকাঙ্ক্ষিত বিমান দুর্ঘটনার ১৫ দিন পর আজ উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে পাঠদান শুরু হয়েছে।
ভয়াবহ যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনার ১২ দিন পর রোববার (৩ আগস্ট) সীমিত পরিসরে খুলেছে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
সুদূর চীনের হেনান শহর থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে সোজা বাংলাদেশের মাদারীপুর সদর উপজেলার চাপাতলী গ্রামে হাজির হয়েছেন ওয়াং এরলিং নামের এক চীনা যুবক। উদ্দেশ্য একটাই, মন দেয়া-নেয়া হওয়া মাদারীপুরের...
বোন জামাই ঘরে তোলার আনন্দঘন মুহূর্ত যে এভাবে রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডিতে রূপ নেবে, তা হয়তো লুদরপুর গ্রামের কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি! ছোট বোনের বিয়ের দাওয়াত নাকি দেয়া হয়নি সময়মতো, শুধুমাত্র এই সামান্য ‘জিদ’...
নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ব্যর্থতা ঢাকতেই বিরোধী দল আন্দোলনের নামে রাজপথে নতুন নাটক শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, দেশ যখন নানা...
ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগে ভারতের রাজধানী দিল্লির কনট প্লেসে ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ বা জাতীয় পতাকা পদযাত্রার পরিকল্পনা করার দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া কাকরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর