আনারের মরদেহ মিলবে না, খণ্ডিতাংশ খুঁজছে পুলিশ

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ১১:১৩ পিএম

রহস্যজনক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার তিনবারের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের পুরো মরদেহ পাওয়ার আশা নেই বলে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

হত্যার পর কেটে কুটে হাড়-মাংস আলাদা করে বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেয়ায় এখন মরদেহের খণ্ডিত অংশ খোঁজা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা প্রধান হারুন অর রশীদ।

ভারতের কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করে বৃহস্পতিবার মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ডিবি প্রধান।

তিনি বলেন, ‘আমরা যেহেতু ক্লু বের করেছি। আশা করি, পুরো দেহ না পেলেও খণ্ডিত অংশ কলকাতা পুলিশ বের করবে।

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্যকে হত্যার পর মরদেহ ফেলার কাজে অংশ নেওয়া সিয়াম নামে একজনকে বুধবার রাতে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশ।

আর ঢাকা থেকে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন হলেন- হত্যাকাণ্ডের মূল সংঘটক আমানুল্লাহ আমান ওরফে শিমুল ভুঁইয়া, শিলাস্তি রহমান ও ফয়সাল আলী ওরফে সাজি।

গোয়েন্দা প্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, হত্যাকাণ্ডে মূল্য পরিকল্পনাকারী আখতারুজ্জামান শাহিন। আর হত্যা মিশনে আমানের নেতৃত্বে অংশ নেয় কয়েকজন। পাশাপাশি আরো কোনো ব্যক্তি এর সাথে জড়িত আছে কিনা, সেটাও আমরা খুঁজে দেখছি।

তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া মূল সংঘটক যে বর্ণনা দিয়েছেন, সেই কথামতো লাশ পাওয়ার কথা না। যে ক্যারি করেছে, সেও তাদের হাতে (কলকাতা পুলিশ) ধরা পড়েছে। পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও অংশবিশেষ হয়ত পাওয়া যাবে।

চিকিৎসার কথা বলে গত ১২ মে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে ভারতের কলকাতায় যাওয়ার পরদিন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান আনোয়ারুল আজিম আনার।

বুধবার সকালে তার খুনের খবর প্রকাশ্যে আসে। পুলিশ বলছে, কলকাতার উপকণ্ঠে নিউটাউনের অভিজাত আবাসন সঞ্জীভা গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে আনারকে খুন করা হয়।

ডিবির বর্ণনায় আনার হত্যাকাণ্ড

সংবাদ সম্মেলনে এমপি আনারকে নৃশংসভাবে হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরেন ডিবি প্রধান হারুন। বলেন, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমে গত ২৪ তারিখে নিউ টাউনে তারা একটি বাসা ভাড়া নেন।

হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আখতারুজ্জামান শাহিন জানান, ৩০ এপ্রিল বাসায় উঠবেন। এরপর আমান ওরফে শিমুল ও গার্লফ্রেন্ড শিলাস্তি রহমানকে নিয়ে বিমানযোগে বাংলাদেশ থেকে কলকাতা চলে যায়। এরপর নিউ টাউনের সঞ্জীভা গার্ডেনে ভাড়া বাসায় উঠে পড়েন।

ডিবি প্রধান বলেন, ’দুইমাস ধরে তারা খেয়াল রাখছেন যে, উনি (আনার) কখন কলকাতায় যান। যেহেতু উনি আগেও মাঝে মাঝেই কলকাতা যেতেন এবং একবার অনেকদিন সেখানে ছিলেন, তাই সেখানে উনার কিছু বন্ধুবান্ধবও আছে।

১২ মে কলকাতায় গিয়ে বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাসায় ওঠেন আনোয়ারুল আজিম আনার। আর এই তারিখেই যে তিনি কলকাতায় যাবে তা পরিকল্পনাকারীরা আগেই জেনেছিল। এ কারণেই কয়েকদিন আগে বাসা ভাড়া করা হয়।

এদিকে ৩০ এপ্রিল কলকাতার বাসায় ওঠার পর হত্যা মিশনে অংশ নিতে শাহিন ও আমান ওরফে শিমুল মিলে সেদেশের আরো দুইজনকে ভাড়া করে। এদের একজন জিহাদ বা জাহিদ, আরেকজন সিয়াম।

হত্যাকাণ্ডের পুরো পরিকল্পনা ও নকশা অর্থাৎ-কোন গাড়িটা ব্যবহার করা হবে, কাকে কত টাকা দিতে হবে, কারা কারা এরসঙ্গে থাকবে- সবকিছু ঠিকঠাক করে হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড শাহিন ১০ মে বাংলাদেশে চলে আসেন বলে জানান হারুন।

আনার ১২ মে কলকাতা গিয়ে বরাহনগরে বন্ধ গোপাল বিশ্বাসের বাসায় ওঠেন। পরেরদিনই ‘কিছু কাজ আছে, বের হতে হবে’ বলে গোপালের বাসা থেকে বের হন তিনি। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আনোয়ারুল আজিম আনার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

আধাঘণ্টায় সব শেষ

ডিবি প্রধান হারুন বলেন, গোপালের বাসা থেকে নিউ টাউনে আসার পর ফয়সাল নামে এক ব্যক্তি তাকে একটি সাদা গাড়িতে রিসিভ করেন। সেখান থেকে নিয়ে কিছুটা এগিয়েই গাড়িতে ওঠেন আসল হত্যাকারী আমান ওরফে শিমুল। সঙ্গে থাকেন ফয়সালও।

সেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন ভারতীয় একজন ড্রাইভার। তার নাম রাজা। তবে সে ‘বেশিকিছু জানে না, জাস্ট ক্যারিয়ার’ বলেন জানান হারুন।

কয়েক মিনিটের মধ্যে গাড়ি গিয়ে পৌঁছে হত্যাকাণ্ডের জায়গা সঞ্জীভা গার্ডেনে। বাসায় পৌঁছানোর পরপরই মুস্তাফিজ নামে আরেকজন ব্যক্তি প্রবেশ করেন। আর ভাড়াটে জিহাদ/জাহিদ ও সিয়াম আগে থেকেই ভেতরে অবস্থান করছিল।

হারুন অর রশীদ, ১৩ মে তারিখ দুইটা ৫১ মিনিটে আনোয়ারুল আজিম আনারকে নিয়ে তারা সবাই বাসায় প্রবেশ করে এবং আধাঘণ্টার মধ্যেই নৃশংস, বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে যায়। আধাঘণ্টা বা একঘণ্টা পর বাসা থেকে একজন বের হয়ে যায়। ভিকটিমের মোবাইল অন করে সেখানে কিছু কথাবার্তা চালায়। আবার কিছুক্ষণ পর ভেতরে আসে।

গোয়েন্দাদের ফাঁকি দেওয়ার জন্য ডিভাইস ব্যবহার করে এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের পরিকল্পনা ছিল এ রকম যে, একদিকে তারা বিদেশের মাটিতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করবে এবং লাশটাকে এমনভাবে গুম করবে যাতে কেউ কোনোদিন খুঁজে না পায়।

আর এই কারণেই মরদেহ বিভিন্ন অংশে ভাগ করে ফেলে তারা। হাড় ও মাংস আলাদা করা হয়। এরপর তা একটা সুটকেসে ভরে ফেলা হয়। সিয়াম ও জিহাদকে নিয়ে সুটকেসসহ আসে আমান ওরফে শিমুল।

রাস্তার পাশে পাবলিক টয়লেটের সামনে অপেক্ষায় থাকা একটি গাড়িতে উঠে পড়ে জিহাদ ও সিয়াম। সুটকেস নিয়ে তারা চলে চলে যায়। তাদেরকে বিদায় দিয়ে বাসায় ফিরে আসে আমানউল্লাহ ওরফে শিমুল।

হারুন বলেন, শিমুল বাসায় ফিরে অন্যদেরকে নিয়ে মরদেহের কেটে ফেলা বাকি মাংসগুলো বিভিন্ন পলিথিনের ব্যাগ ভর্তি করে। মাংসের সঙ্গে মাখানো হয় হলুদ, মশলা। পলিথিনে মাংস নিয়ে বাসা ত্যাগ করে সবাই। কেই যাতে কেউ সন্দেহ না করে, সেজন্য মাংসের সঙ্গে হলুদ-মসলা মাখানো হয়। 

গোয়েন্দারা বলছে, হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড আক্তারুজ্জামান শাহিন।

ডিবি প্রধান বলেন, উদ্দেশ্য ছিলো এমনভাবে গুম করা যে, যেন কেউ কোনোদিন তার অস্তিত্ব না পায়। হত্যা মিশন শেষ করার পর একে একে বাংলাদেশে ফিরতে শুরু করে তারা। মূল হত্যাকারী শিমুল ও তার গার্লফ্রেন্ড শিলাস্তি রহমান ১৫ মে বাংলাদেশে চলে আসে।

পরেরদিন ফেরে মুস্তাফিজ। পর্যায়ক্রমে সবাই বাংলাদেশে ঢুকে আসার পর হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড শাহিন ভিস্টারা এয়ারলাইন্সে দিল্লিতে ট্রানজিট নিয়ে কাঠমান্ডুতে চলে যায়। এরপর সেখান থেকে হয়ত অন্য কোথাও চলে যেতে পারে এবং চলে গেছে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দা প্রধান হারুন।  

গোয়েন্দাদের ফাঁকি দিতে বিভ্রান্তি

তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার একটা অংশ। অনেকদিন দরে তারা একটা সুযোগ খুঁজছিল যে, ভিকটিম কোন সময় ওই দেশে ঢোকে। শুধু তাই না, এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডটা করার পরে আমরা যারা তদন্ত কর্মকর্তাদের ফাঁকি দিতে মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে একের পর এক বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়।

আনোয়ারুল আজিম নিখোঁজের পর ১৮ মে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন গোপাল বিশ্বাস। এর আগে হত্যাকারীরা মোবাইলগুলোতে বিভিন্ন ধরনের বার্তা পাঠান। কখনো ভিকটিমের মোবাইল থেকে গোপাল বিশ্বাসের কাছে ফোন দেয়া, আবার কখনো বাংলাদেশের কারো কাছে রিং দেয়া, আবার কখনো বিহার থেকে কল করা।

গোয়েন্দা প্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, এসবের মাধ্যমে তারা বোঝাতে চেয়েছে যে, ভিকটিম কিন্তু এখনো ঠিক আছে। সর্বশেষ একটা বার্তা পাঠিয়েছে যে, আমি দিল্লি যাচ্ছি। অমিত শাহর সঙ্গে আমার দেখা হবে। প্রধানমন্ত্রী ভারত যাবেন। সেখানে আমার মন্ত্রিত্ব পাওয়া নিয়েও কথা হবে।

অপরাধ করার পরে তা ভিন্নখাতে নিয়ে যাওয়া এবং অপরাধের নামগন্ধ যেন না থাকে, সে কারণেই মোবাইলটাকে বেনাপোল সীমান্তের দিকেও আনা হয়। কখনো পাঠানো হয় বিহারের মোজাফফরপুরে।

যৌথ অভিযান

তবে কলকাতার ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ, পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) ও পুলিশ সবার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে বলে জানান হারুন। বলেন, তারাও আমাদের কাছে বিভিন্ন তথ্য নিচ্ছে। আমরাও তাদের কাছে বিভিন্ন তথ্য নিচ্ছি।

ডিবি প্রধান বলেন, আমরা মনে করি বাংলাদেশে মাটিতে তারা অপরাধটা করার সাহস পায়নি। গুলশান ও বসুন্ধরার দুইটি ফ্ল্যাটে পরিকল্পনা হয়। বাংলাদেশ করলে ধরা পড়ার আশঙ্কায় তারা কলকাতায় করেছে।

‘আমাদের তদন্ত চলছে। আমি মনে করি মাননীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম হত্যাকাণ্ডটা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে হারুন বলেন, মূল হত্যাকারী আমানউল্লাহ আমানের আসল নাম শিমুল ভুঁইয়া। সে নতুন একটি পাসপোর্ট করেছে আমানুল্লাহ নামে।আগে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির বড় নেতা ছিলেন। খুলনা, যশোরে তার নামে অনেকগুলো হত্যা ও অস্ত্র মামলা আছে। 

আরবি
টাইমলাইন: আনোয়ারুল আজিম আনার
‘ভাতের হোটেল’ খ্যাত সাবেক ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ, তার স্ত্রী ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে আলাদা তিনটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীম আনারকে খুনের উদ্দেশ্যে অপহরণের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন রেজাউল করিম মল্লিক।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার প্রথম চার্জশিট বারাসাত আদালতে জমা দিয়েছে কলকাতার সিআইডি পুলিশ। 
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ফ্যাসিলিটিস ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব মনোনীত হয়েছেন দেলোয়ার হোসেন শাহীন। 
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বিদেশে পাচার করা অর্থ ব্যবহার করে দেশকে আবারও অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু।
জনপ্রত্যাশা পূরণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত থেকে দেশপ্রেম, সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দি মোছা. রিম্পাকে (২১) গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। 
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর