প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে জেরে এখনো বিদ্যুৎহীন রয়েছে দেশের এক তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ। সংযোগ স্বাভাবিক হতে আরো একদিন লেগে যেতে পারে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিনের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে শুধু মাত্র পল্লী বিদ্যুতেরই তিন কোটি তিন লক্ষ নয় হাজার সাতশত দুইজন গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এরপর বিদ্যুৎ বিভাগের প্রচেষ্টায় এক কোটি একত্রিশ লক্ষ ছত্রিশ হাজার সাতশত দুইজনের সংযোগ পুনঃস্থাপিত করা হয়েছে।
তবে পল্লী বিদ্যুতে এখনও এক কোটি একাত্তর লক্ষ তিয়াত্তর হাজার গ্রাহক এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার ছয়শ আটাশ জন গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগহীন রয়েছে।
দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নে ফলে গত দেড় দশকে গ্রাহক সংখ্যা প্রায় পাঁচগুণ বেড়ে এখন হয়েছে চার কোটি ৭০ লাখ। এর সঙ্গে আরো পাঁচ লাখ সেচ সংযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঠিকাদারসহ ৩০ হাজারের বেশি জনবল মাঠে কাজ করছে। আশা করা যাচ্ছে অতিসত্বর সম্পূর্ণ সংযোগ চালু হবে।
রোববার সন্ধ্যা ছয়টায় ৫০ শতাংশ, রাতের মধ্যে ৬০ শতাংশ এবং বুধবার সকালের মধ্যে ৩৩ কেভি ও ১১ কেভি লাইন চালুর মাধ্যমে ৮০ শতাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাকী গ্রাহকদের সার্ভিস ড্রপ ও মিটার বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করতে হবে বলে তাদের বিষয়ে পরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব কত প্রলয়ংকারী হতে পারে, আবারো তার সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। রোববার সন্ধ্যায় আঘাত হানার পর সময় যত গড়াচ্ছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে প্রবল রিমালের ধ্বংসলীলা।
দমকা বাতাস আর ভারী বৃষ্টি কমতে শুরু করার পর থেকেই দেশের উপকূলীয় এলাকায় ঘুর্ণিঝড়ের তাণ্ডবলীলার ক্ষত চিহ্নগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে।
আঘাত হানার পর কিছুটা দুর্বল হয়ে স্থল নিম্নচাপে রূপ নিলেও, প্রায় ৩৬ ঘণ্টা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চালায়। সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক হিসাবে বলা হয়েছে, দেড় লাখের বেশি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাড়ে ৩৭ লাখ মানুষ। আর কেড়ে নিয়েছে দশটি প্রাণ।
প্রবল জোয়ারের তোড়ে বহু জায়গায় বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ উপকূলের বহু এলাকা। জলোচ্ছ্বাসের ১০ থেকে ১২ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা সেখানে। ভেসে গেছে উপকূলের বহু মাছের ঘের, প্লাবিত হওয়া উপকূলের নিম্নাঞ্চলে ঢুকে পড়েছে লবণাক্ত পানি।
১৫ বছর আগে বাংলাদেশের ভূমিতে ঘূর্ণিঝড় আইলা যে প্রলয় চালিয়েছিলো, রিমালের দীর্ঘসময় ধরে চালানো তাণ্ডবেও একই রকমের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে সরকারের সংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারা মনে করছেন।
আর এসবের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার বিদ্যুৎ বিভাগ। পোল উপড়ে, তার ছিড়ে, ট্রান্সফরমার ভেঙে নানাভাবে ক্ষয়ক্ষতির হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে।

বিদ্যুতের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে। বলা হয়েছে, প্রায় ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এলাকা এবং ওজোপাডিকোর বিতরণ লাইন ক্ষতির শিকার হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুতের বিচ্ছিন্ন গ্রাহক সংখ্যা তিন কোটি তিন লাখ নয় হাজার ৭০২। পুনঃসংযোগ দেয়া হয়েছে এক কোটি ৩১ লাখ ৩৬ হাজার ৭০২ গ্রাহককে। সংযোগহীন রয়েছে এক কোটি ৭১ লাখ ৭৩ হাজার গ্রাহক।
৩৩ কেভি ফিডার: ক্ষতি-৭৬৬, রিকভারি-৪৫৫, রিকভারি অবশিষ্ট- ৩১১।
৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র: ক্ষতি-১১০৫, রিকভারি-৬৫৪, রিকভারি অবশিষ্ট- ৪৫১।
১১ কেভি ফিডার: ক্ষতি-৬২৩৫, রিকভারি-২৩৮৪, রিকভারি অবশিষ্ট-৩৮৫১।
বৈদ্যুতিক খুঁটি: ক্ষতি-৩৮৩৩, রিকভারি-২৫৬৭, রিকভারী অবশিষ্ট-১২৬৬।
বিতরণ ট্রান্সফরমার: ক্ষতি-২৮১৮, রিকভারি-১৬৯৬, রিকভারি অবশিষ্ট-১১২২।
তার ছেড়া স্প্যান: ৩০৫৬ কিলোমিটার, রিকভারি-১৩৬৩ (কি:মি:), রিকভারি অবশিষ্ট- ১৬৯৩ (কি:মি:)।
ইন্সুলেটর: ক্ষতি-২৪২৫৮, রিকভারি-৭৭২৫, রিকভারি অবশিষ্ট-১৬৫৩৩।
মিটার: ক্ষতি-৫৯৩৯৯, রিকভারি-৩০৯৩৩, রিকভারি অবশিষ্ট-২৮৪৬৬।
পল্লী বিদ্যুতে প্রাথমিক তথ্যানুসারে ১০৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। আর ওজোপাডিকোর ক্ষয়ক্ষতি পাঁচ কোটি সাত লক্ষ একাশি হাজার সাতশত দুই টাকা।
যে ক্ষতি করে গেলো ঘূর্ণিঝড় রিমাল