বাংলাদেশের উপকূলসহ দক্ষিণাঞ্চলে বিশাল এলাকাজুড়ে তাণ্ডব চালিয়ে সিলেট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের আসামে গিয়ে নিঃশেষিত হয়েছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমাল। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সঙ্গে চলছে তীব্র ঝোড়ো বা দমকা হাওয়া। উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকেছে পানি। ঝড়ের দাপটে বিলীন হয়েছে বসতি ও গাছপালা।
ঘূর্ণিঝড় রিমাল খুব ভয়ংকর রূপধারণ না করলেও, দীর্ঘসময় ধরে উপকূলে অবস্থান করেছে। দীর্ঘ সময় ছিল সাগরের বুকেও। অগ্রভাগ উপকূলে স্পর্শ থেকে শুরু করে নিম্নচাপ পর্যন্ত প্রায় ৪৮ ঘণ্টা স্থলভাগে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। এর আগে বাংলাদেশে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়গুলো দুই থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশ ভূখণ্ড অতিক্রম করে গেছে। সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা এর প্রভাবে দমকা হাওয়া ও বৃষ্টি ঝরেছে।
সেই হিসেবে ঘূর্ণিঝড় রিমাল বেশ ব্যতিক্রমী আচরণ করেছে। টানা আড়াই দিন বৃষ্টি ঝরিয়েছে দেশে। ওয়েদার চ্যানেল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় উপকূলে উঠার পর স্থলভাগের উপর দিয়ে ধীর গতিতে অগ্রসর হবার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরেক বেশি বেড়ে যাবার ঝুঁকি থাকে। সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হলো, অতিবৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সৃষ্ট প্লাবন।

ওয়েদার চ্যানেল বলছে, ঘূর্ণিঝড় স্থলভাগে কতটা সময় ধরে থাকবে অথবা কি গতিতে অগ্রসর হবে তার সঙ্গে ঝড়ের কেন্দ্রের তাপমাত্রার সম্পর্ক আছে। একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে বায়ু উষ্ণতর হয় এবং এই উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ঝড়ের কেন্দ্রে বায়ুচাপ আশেপাশের বায়ুমণ্ডলের সাথে ধীর গতিতে হ্রাস পায়। তবে যদি কোন ঘূর্ণিঝড় স্থলভাগে ধীরগতিতে অতিক্রম করে তাহলে সেটি দুর্যোগের পরিমাণও বাড়াবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, সাগরে প্রচুর তাপ তৈরি হচ্ছে। বাড়তি তাপ অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করে। সাগরে ১ ডিগ্রি তাপ বাড়লে বায়ুপ্রবাহ ৭ শতাংশ বেড়ে যায়। তাপ ধারণ করতে করতে ভেতরে শক্তি বেড়ে যায়, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বৃষ্টির মাধ্যমে। ঘূর্ণিঝড় রিমাল সৃষ্টির সময় বঙ্গোপসাগরে ছিল অতিরিক্ত উষ্ণতা। এ সময়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকার কথা ২৬ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু দুই মাস ধরে সেখানে তাপমাত্রা ছিল ২৯ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ধীর গতিতে চলমান গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় বা হারিকেনের প্রভাব একটি নির্দিষ্ট স্থানে বেশ কয়েকদিন ধরে চলতে পারে। এতে বৃষ্টিজনিত বন্যা বিপজ্জনক উদ্বেগের বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় বা হারিকেন উপকূলের কাছাকাছি কিংবা স্থলভাগের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হলে সেটি জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। কারণ এতে করে প্লাবনের শঙ্কা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি জনজীবন বিপর্যস্ত হয়।

এখন প্রশ্ন হলো, কেন ঘূর্ণিঝড় উপকূল থেকে স্থলভাগের মধ্যে দিয়ে ধীর গতিতে অগ্রসর হচ্ছে? ন্যাশনাল সেন্টার ফর এনভায়রোনোমেন্টাল ইনফরমেন- এনসিইআই- এর বিজ্ঞানী জিম কোসিনের এক নতুন গবেষণা থেকে জানা গেছে, আগের তুলনায় একটি ঘূর্ণিঝড় উপকূলের দিকে এবং স্থলভাগের উপর দিয়ে অগ্রসর হতে যথেষ্ট বেশি সময় নিচ্ছে। এর জন্য তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকেই দায়ী করছেন।
বিজ্ঞানী কোসিন দেখিয়েছেন যে, ১৯৪৯ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের গতি ১০ শতাংশ কমেছে। ‘এ গ্লোবাল স্লোডাউন অফ ট্রপিক্যাল সাইক্লোন ট্রান্সলেশন স্পিড’ শিরোনামে নেচারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে কোসিন দেখান, ঘূর্ণিঝড়ের গতি কমে আসার সঙ্গে পৃথিবীর উষ্ণায়নের সম্পর্ক আছে। তিনি বলতে চেয়েছেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়াই মূল কারণ।
তাঁর সমীক্ষা বলছে, উত্তর ভারত মহাসাগর ব্যতীত উভয় গোলার্ধে এবং সব সাগর অববাহিকায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের গতি কমেছে। এর মধ্যে উত্তর গোলার্ধে আরও ধীর হয়েছে। আঞ্চলিকভাবে, পশ্চিম উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে সবচেয়ে ধীরগতি দেখা গেছে ২০ শতাংশে, তারপরে অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলের ১৫ শতাংশে। আর গতি কমে যাবার কারণে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে স্থানীয়ভাবে বৃষ্টি এবং মিঠা পানির বন্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কোসিন বলেন, স্থলভাগের উপর দিয়েও ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের গতি কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আটলান্টিকে ২০ শতাংশ, পশ্চিম উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে ৩০ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ান অঞ্চলে ১৯ শতাংশ কমে গেছে। ২০১৭ সালে হারিকেন হার্ভের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশগত কারণগুলোর একটি জটিল মিথস্ক্রিয়া একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় কতটা তীব্র করতে পারে সেক্ষেত্রে এই ঘূর্ণিঝড়টি উদাহরণ হয়ে থাকবে।
ঘূর্ণন শক্তি একটি একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় কত দ্রুত চলবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালন পরিবর্তিত হয়েছে। এর কারণে ঘূর্ণিঝড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে অগ্রসর হতে আগের চেয়েও বেশি সময় লাগছে। উপকূল ও স্থলভাগে আগের চেয়ে বেশি জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাবার কারণে ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রসর হবার গতি বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।
কোসিন বলেন, বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন আছে। তবুও, এটা বলা যেতে পারে যে, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে প্রত্যাশিত বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে যাবার পরিবর্তে স্থানীয় বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি ঘূর্ণিঝড়ের এই ধীরগতির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। তিনি বলেন, পরিবর্তিত জলবায়ু কীভাবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়কে প্রভাবিত করছে তা নিয়ে ক্রমাগত গবেষণা অপরিহার্য।
ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের (নোয়ামি) নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার দাশ বলেন, ঝড় নিয়ে অবশ্যই আরও গবেষণা করা উচিত। সামনে ঘূর্ণিঝড়গুলোর পূর্বাভাস দেয়ার ক্ষেত্রে এই ঝড়ের (রিমাল) অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। আবহাওয়া ও জলবায়ুতে পরিবর্তন আসছে। এসব বদল এ অঞ্চলে দুর্যোগের চরিত্রে পরিবর্তন নিয়ে আসছে। এই ঝড় থেকে আমরা সেই শিক্ষাই পেলাম।
যে ক্ষতি করে গেলো ঘূর্ণিঝড় রিমাল
এখনও অচল দেশের ৪৫% মোবাইল সাইট