গাজা উপত্যকায় বিধ্বস্ত একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের উপর দিয়ে উঠতে গিয়ে এক বাবা যা দেখতে পেলেন তাতে কোন ভুল নেই। ধূসর ধ্বংসস্তূপের উপরে জ্বলজ্বল করছিলো রঙিন কাপড়। খলিল খাদের ধুলোমাখা আর ছেঁড়া শিশুর পায়জামা তুলে নিলেন এবং তাৎক্ষণিক ভেসে গেলেন পুরোনো সব স্মৃতিতে।
বাবা খলিলের উঠিয়ে নেয়া পায়জামাটি তার আদরের দুলালি রোজা’র। তার ১৮ মাস বয়সী কন্যা সন্তানের, যে ছিলো গোটা পরিবারের আদরের মধ্যমণি। খলিল তার ফোনে একটি ভিডিও দেখায়। রোজা একই নীল রঙা পায়জামা পরা এবং এবং দুই স্বজনের হাত ধরে আছে। তারা তিনজন একটি বৃত্তে নাচছে।
ভিডিওটি স্লো মোশনে শুট করা, তাই মনে হচ্ছে যেন শিশুরা মৃদু বাতাসে দুলছে। তারা হাসছে। সেটি ছিলো তাদের খেলার সময়। তখনও তাদের জীবন যুদ্ধ দ্বারা ছাপিয়ে যায়নি। খলিল একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ। বয়স ৩৬। রাফাহ শহরের আল-নাজ্জার হাসপাতালের একজন কম্পিউটার প্রকৌশলী এবং চার সন্তানের পিতা। ইব্রাহিম ৯ বছর বয়সী; অমল, বয়স পাঁচ; কিনান আড়াই এবং রোজা শেষ জন্ম।
খলিল ধ্বংসস্তূপের উপর দিয়ে সাবধানে পা বাড়ালো। হাসপাতাল থেকে বাসা মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। সেখানে এখন রাজমিস্ত্রি এবং ধাতুর ঢিবি, গৃহস্থালির জিনিসপত্র এবং কিছু শিশুদের খেলনা রয়েছে। একটি ছোট ড্রাম। একটি খেলনা পিয়ানো। ভবনটিতে যে রাতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, সেই ২০ অক্টোবর খলিল হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন।

ঘটনাস্থলটি দেখতে যাওয়া বিবিসি প্রতিনিধিকে খলিল খাদের বলছিলেন, একটি বিশাল বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে । আমার প্রতিবেশীরা হাসপাতালে আসছে। তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় বোমা হামলা হলো? তারা আমাকে বলল, এটা তোমার বাড়ির আশেপাশে ছিলো। পরিবারের খোঁজ নিতে আমি ছুটে গেলাম বাড়ির দিকে। যেতে যেতে আমি ফোর করলাম, কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছিলো না। কারণ পুরো ভবনই বিধ্বস্ত।
ইসরাইলি গোলার আঘাতে খলিলের পরিবারের ১১ সদস্য নিহত হন। এদের মধ্যে ছিলেন তার চার সন্তান, তার দুই বোন, তার ৭০ বছর বয়সী বাবা, তার ভাই এবং তার শ্যালিকা ও তার দুই মেয়ে। তাদের মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে খলিলের কর্মস্থল সেই হাসপাতালের উঠানে সাদা কাফনে মোড়ানো হয়। বোমা বিস্ফোরণে খলিলের স্ত্রী গুরুতর আহত হন। বাড়িটি ধসে পড়ায় পর তাকে দগ্ধ এবং গুরুতর আঘাতের জন্য হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে।
খলিল গাজায় যুদ্ধের ইতিহাস জানেন। মাত্র ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটারের এই ছোট্ট উপত্যকায় যুদ্ধ আর ধ্বংসের হাজার বছরের ইতিহাস তার পড়া। খলিল ভালো করেই জানতেন, এমন একটি ভূমিতে জন্ম নেয়া ও বেড়ে উঠার ঝুঁকি। বিশেষ করে হত কয়েক দশকের কয়েক দশক ধরে তিনি যে সংঘর্ষ দেখছেন, তাতে সব সময়ই সেখানে একটি পরিবার গড়ে তোলা নিয়ে সারাক্ষণই চিন্তিত ছিলেন।
খলিল স্মরণ করেন, আমার মনে আছে ২০১৪ সালের যুদ্ধে আমার স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন। সে সময় আমাদের প্রতিবেশীদের উপর বোমা হামলা হয়েছিল। স্ত্রী সপ্তম মাসে চলছিলো এবং বিস্ফোরণের শব্দে সিঁড়ি দিয়ে নিচে পড়ে গিয়েছিল এবং আমি ভাবছিলাম কীভাবে তাকে ও বাচ্চাদের বাঁচাবো। এটাই জীবন আমাদের।

তিনি আরও বলেন, আমার প্রতিটি বাচ্চার জন্য আমার একটি স্বপ্ন ছিল। ইব্রাহিম তার স্কুলে প্রথম ছিল এবং আমি তাকে একজন ডাক্তার হিসাবে দেখার স্বপ্ন দেখেছিলাম। অমল খুব সৃজনশীল ছিল, সে আঁকতে পছন্দ করতো এবং সে আমাকে তার আঁকা দেখাতো। মাঝে মাঝে আমি তার সাথে আঁকাআঁকির চেষ্টা করতাম।
খলিল বলতে থাকেন, কিনান খুব কৌতুকপ্রিয় ছিল, সবাই তাকে ভালোবাসত। এবং সে তার ছোট বোনের যত্ন নিতো। তিনি রোজাকে রক্ষা করার জন্য সব সময় তার সঙ্গে লেগে থাকতো। বলতেন, ওকে স্পর্শ করবেন না, সে আমার বাচ্চা! এখন তারা সবাই চলে গেছে। আর কখনও ফিরবে না।
খলিল এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে বোনের লাশ খুঁজছেন। পাশাপাশি তাকে হাসপাতালে স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতে হচ্ছে। তার সন্তানরা চলে গেছে। ইব্রাহিম, আমাল, কেনিন ও রোজার একের পর এক ছবি দেখাতে গিয়ে তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে এক অমানিস বিষণ্নতা, এতো শোকে তো চোখের জলও ফুরিয়ে যায়।
গাজার আরো ভেতরে ইসরাইলি ট্যাঙ্ক, লড়ছে হামাসও
ইসরাইল-গাজা সংঘাত: তুরস্কে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী 