দুই বছর যুদ্ধের পর গাজার ভেতরে এখন যে অবস্থা

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৪৪ এএম

গাজা সিটির দিকে মুখ করা যে কোনো একটি উঁচু মাটির বাঁধ থেকে ভেতরের দিকে তাকালেই চলমান যুদ্ধের ভয়াবহতা সহজেই বোঝা যায়। একসময়ের পরিচিত গাজার মানচিত্র ও স্মৃতি বিলীন হয়ে গেছে। তার জায়গায় এখন ১৮০ ডিগ্রি জুড়ে শুধু ধূসর ধ্বংসস্তূপের এক স্থির ল্যান্ডস্কেপ, বেইত হানুন থেকে গাজা সিটি পর্যন্ত সর্বত্র কেবলই ধ্বংসের চিহ্ন।

প্রায় দুই বছরের যুদ্ধের পর গাজার ভেতরে সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপ দেখতে পেয়েছে বিবিসির সংবাদদাতারা। তারা সেসব ভয়াবহ দৃশ্য তুলে ধরেছেন।

বিবিসির ওই সংবাদদাতারা বলেছেন, গাজা সিটির অভ্যন্তরে এখনও কিছু ভবনের দূরবর্তী আকৃতি দেখা গেলেও, একসময় যেখানে হাজার হাজার মানুষের বসতি ছিলো, সেই এলাকাগুলো এখন চেনার উপায় নেই। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহগুলোতে এই এলাকাতেই ইসরাইলি স্থলবাহিনী প্রথম প্রবেশ করেছিলো এবং এরপর হামাস পুনরায় সংগঠিত হওয়ায় তারা একাধিকবার ফিরে এসেছে এবং প্রতিবারেই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

গাজা থেকে স্বাধীনভাবে সংবাদ পরিবেশনের অনুমতি ইসরাইল দেয় না। তবে গত মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) তারা সাংবাদিকদের একটি দলকে, যার মধ্যে বিবিসিও ছিলো; স্ট্রিপের ইসরাইলি বাহিনীর দখলকৃত এলাকা ঘুরে দেখায়।

সাংবাদিকদের এই সীমিত সফর ছিলো অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কথা বলার বা গাজার অন্যান্য এলাকায় প্রবেশের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। এছাড়া, ইসরাইলের সামরিক সেন্সরশিপ আইনের কারণে এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সামরিক কর্মীদের দিয়ে যাচাই করানো হয়। তবে বিবিসি সবসময়ই এই রিপোর্টের ওপর তার সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

ইসরাইলের দাবি: ‘ধ্বংস নয়, লক্ষ্য সন্ত্রাস দমন’

পরিদর্শন করা এলাকার ধ্বংসের মাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসরাইলি সামরিক মুখপাত্র নাদাভ শোশানি জানান, ধ্বংস তাদের ‘লক্ষ্য নয়’।

তিনি বলেন, লক্ষ্য হলো সন্ত্রাসীদের সঙ্গে লড়াই করা। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই টানেলের মুখ ছিলো, বুবি-ট্র্যাপ পাতা ছিলো বা আরপিজি (রকেট-চালিত গ্রেনেড) বা স্নাইপার স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের হামলায় ১,১০০ -এরও বেশি মানুষ নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর থেকে, হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ৬,৮০০০ -এর বেশি গাজাবাসী নিহত হয়েছেন।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল শোশানি জানান, এই এলাকায় ইতোমধ্যে কয়েকজন জিম্মির মরদেহ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইতায় চেনের মরদেহও রয়েছে, যা হামাস এই সপ্তাহে ইসরাইলের কাছে হস্তান্তর করেছে। এখনও নিখোঁজ আরো সাতজন জিম্মির লাশের সন্ধান চলছে।

বিবিসি দলটি যে সামরিক ঘাঁটিতে গিয়েছিল, সেটি হলুদ লাইন থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে অবস্থিত। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় নির্ধারিত এই ‘হলুদ লাইন’ হলো অস্থায়ী সীমানা, যা ইসরাইলি বাহিনী-নিয়ন্ত্রিত গাজার এলাকাগুলোকে হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে আলাদা করে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে মাটিতে ব্লক বসিয়ে এই হলুদ লাইন চিহ্নিত করছে, যাতে হামাস যোদ্ধা এবং বেসামরিক নাগরিক উভয়কেই সতর্ক করা যায়।

যুদ্ধবিরতির এক মাস পার হলেও ইসরাইলি বাহিনী বলছে, হলুদ লাইন বরাবর হামাসের গুলিবাজদের সাথে তাদের ‘প্রায় প্রতিদিন’ লড়াই চলছে। গাজা সিটির দিকে মুখ করা বাঁধগুলোতে গুলির খোসার স্তূপ সেই গুলির স্থানগুলোকে চিহ্নিত করছে।

অন্যদিকে, হামাস ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ‘শত শতবার’ অভিযোগ করেছে এবং হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এর ফলে ২৪০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

কর্নেল শোশানি জোর দিয়ে বলেন, ইসরাইলি বাহিনী মার্কিন নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে তারা এটাও নিশ্চিত করবে যে হামাস যেন আর ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিকদের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে না পারে।

তিনি বলেন, সকলের কাছে খুব স্পষ্ট যে হামাস সশস্ত্র এবং গাজা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। এটি এমন কিছু যা সমাধান করা হবে, কিন্তু আমরা তার থেকে অনেক দূরে।

হামাসের উল্টো চিত্র: নিরস্ত্রীকরণের বদলে অস্ত্রসজ্জা

মার্কিন নেতৃত্বাধীন পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে এবং ক্ষমতা আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে থাকা একটি ফিলিস্তিনি কমিটির হাতে তুলে দিতে হবে। এই কমিটির তত্ত্বাবধানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও থাকবেন।

কিন্তু ক্ষমতা ও অস্ত্র ছাড়ার পরিবর্তে, কর্নেল শোশানি অভিযোগ করেন, ‘হামাস উল্টোটা করছে।’

তিনি বলেন, হামাস নিজেকে সশস্ত্র করার চেষ্টা করছে, আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, গাজার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তারা দিনের আলোয় মানুষ হত্যা করছে, বেসামরিক নাগরিকদের আতঙ্কিত করছে এবং নিশ্চিত করছে গাজায় কে ‘বস’ তা যেন সবাই বুঝতে পারে। আমরা আশা করি এই চুক্তি যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করবে যাতে হামাস নিরস্ত্র হয়।

ইসরাইলি বাহিনী সাংবাদিকদের টানেলের একটি মানচিত্র দেখায়, যা তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে পেয়েছে— এটিকে তারা ‘মাকড়সার জালের মতো একটি বিশাল নেটওয়ার্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। কিছু টানেল ইতোমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে, কিছু এখনও অক্ষত, এবং কিছু টানেলের খোঁজ এখনও চলছে।

শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

আপাতত হামাস ও ইসরাইলের একটি শান্তি চুক্তি হলেও পরবর্তী ধাপে কী ঘটবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। যুদ্ধবিরতি ইতোমধ্যে দু’বার ব্যর্থ হওয়ায় ওয়াশিংটন পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা সম্পর্কে সচেতন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ভঙ্গুর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে একটি আরও স্থায়ী শান্তির দিকে যেতে কঠোর চাপ সৃষ্টি করছে।

বিবিসি দেখেছে, তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের কাছে একটি খসড়া প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যা গাজার নিরাপত্তা গ্রহণ এবং হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর দুই বছরের মেয়াদের রূপরেখা দিয়েছে।

কিন্তু চুক্তির এই পরবর্তী ধাপের বিস্তারিত তথ্য কম: হামাসের নিরস্ত্রীকরণের আগে গাজাকে নিরাপদ করতে কোন দেশগুলো সৈন্য পাঠাবে, ইসরাইলের সৈন্যরা কখন প্রত্যাহার করবে, বা গাজার নতুন প্রযুক্তিগত প্রশাসনের সদস্যরা কীভাবে নিযুক্ত হবে, তা স্পষ্ট নয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গাজাকে বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত একটি ভবিষ্যৎমুখী মধ্যপ্রাচ্যের হাব হিসেবে দেখতে চান। আজকের গাজা থেকে সেই স্বপ্ন অনেক দূরের।

ইসরাইল দ্বারা ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং ট্রাম্পের দ্বারা একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, প্রশ্ন শুধু কে লড়াই বন্ধ করতে পারে তা নয়, বরং গাজাবাসী তাদের সম্প্রদায় এবং ভূমির ভবিষ্যতে কতটা বল প্রয়োগ করতে পারবে।

একাত্তর/আরএ
টাইমলাইন: হামাস-ইসরাইল সংঘর্ষ
০৬ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৪৪
দুই বছর যুদ্ধের পর গাজার ভেতরে এখন যে অবস্থা
১১ অক্টোবর ২০২৫, ১৩:৩৯
১৮ অক্টোবর ২০২৪, ২০:৫৪
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞ থামেনি। সবশেষ দখলদারদের ড্রোন হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় শিশুসহ অন্তত সাত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে আয়োজিত এক সম্মেলনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন, তিনি গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য দেশটির সামরিক...
পবিত্র ঈদুল আজহার এই সময়টাতে মাযেন আল-জেরজাওয়ির দম ফেলার ফুসরত থাকার কথা ছিল না। গাজা সিটির অন্যতম শীর্ষ পশুপালকের খামারে শত শত ভেড়া আর ছাগলের ডাক, আর ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর থাকত চারপাশ। কিন্তু আজ...
দীর্ঘ দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর এবার কিছুটা আপেক্ষিক শান্তিতে পবিত্র রমজান মাস শুরু করেছেন গাজাবাসীরা। গত ১০ অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও,...
ইরানের ওপর মার্কিন বিমান হামলা জোরদার করার পাশাপাশি যুদ্ধের পরিধি আরও বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানকে নতি স্বীকার করাতে ওয়াশিংটনের এই সামরিক...
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে এক মাসের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি গত সপ্তাহে ভেস্তে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে, জর্ডানে...
আমেরিকার সাথে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে ইরান। দেশটির কট্টরপন্থীরা বর্তমান দৃশ্যমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক নীরব অভ্যুত্থান...
ঢাকায় কর্মরত কুমিল্লা জেলার সাংবাদিকদের সংগঠন ‘কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম, ঢাকা’র (সিজেএফডি) নির্বাহী কমিটির নির্বাচন-২০২৬ সম্পন্ন হয়েছে। এতে সভাপতি পদে দৈনিক ইনকিলাবের বিশেষ প্রতিনিধি সাঈদ আহমেদ খান...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর