ফিলিস্তিনে হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ আর ইয়েমেনের হুতিদের একের পর এক আক্রমণে কোণঠাসা ইসরাইল। মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র ইহুদি রাষ্ট্রটি চোখে এরইমধ্যে দেখছে সর্ষে ফুল। নিজেদের পিঠ বাঁচাতে তাই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সাহায্য চেয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করছে মধ্যপ্রাচ্য নতুন জোট গড়ার। নেতানিয়াহুর আহ্বানে কী সাড়া দেবে যুক্তরাষ্ট্র?
আমেরিকার সফর গিয়ে পাগলের মত নিজের কথাই বলে গেছেন নেতানিয়াহু। গাজায় চলমান যুদ্ধ শেষে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি জোট গড়ার আহবানও জানিয়েছেন তিনি। নেতানিয়াহু বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই জোট গড়তে পারে। নতুন এই জোটের নাম দেন ‘আব্রাহাম জোট’।
ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একের পর এক মিথ্যার ফুলঝুড়ি ফুটতে থাকে নেতানিয়াহুর মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেতে একের পর এক কথার ফাঁদ পাতেন তিনি। বলেছেন, আমাদের শত্রুরা আপনাদেরও শত্রু। আমাদের লড়াই আপনাদেরও লড়াই। সেই সঙ্গে আমাদের বিজয় আপনাদেরও বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হবে।
প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী ভাষণের মাঝে চাটুকার আইন প্রণেতারা যেমন হাততালিতে ফেটে পড়েছেন, তেমনি অনেক শীর্ষ ডেমোক্র্যাটিক নেতা চুপ করে বসে ছিলেন। তবে তার এ বক্তৃতা ডেমোক্র্যাট সিনেটররা বর্জন করেন এবং কংগ্রেসে তার ভাষণের বিরোধিতা করেন।
অনুপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, যিনি সিনেটেরও সভাপতি। হ্যারিস বলেন, যে তাকে পূর্ব-নির্ধারিত একটি সভায় যেতে হয়েছে। রিপাবলিকান দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সেনেটর জে ডি ভ্যান্সও নির্বাচনী ব্যস্ততার কথা বলে কংগ্রেসের সভায় আসেননি।

মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষের যৌথ সভায় বুধবার এক জোরাল ভাষণে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধকে সমর্থন করেন। এবং আমেরিকান বিক্ষোভকারীদের নিন্দা করেছেন।
কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটলের বাইরে চলমান বিক্ষোভের উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়ে তিনি যারা যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ ক্যাম্পাসে এবং অন্যত্র বিক্ষোভ করছে, তাদের লক্ষ্য করে উপহাস করেন। তিনি তাদের ইসরাইলের শত্রুদের পক্ষের ‘বোকা’ বলে অভিহিত করেন।
যুদ্ধ বন্ধ এবং বাকি জীবিত পণবন্দীদের মুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্র আরব দেশগুলো যে চেষ্টা করছে, নেতানিয়াহু তার কোনো উল্লেখ করেননি। গত বছর ৭ অক্টোবর হামাস দক্ষিণ ইসরাইলে হামলা চালিয়ে পণবন্দীদের ধরে নিয়ে যায়, যার ফলে যুদ্ধের শুরু হয়।
নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন যে, আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদকারীরা উগ্রবাদীদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, যে উগ্রবাদীরা তার ভাষায় ৭ অক্টোবরের হামলার সময় শিশুদের হত্যা করে। তিনি বলেন, যে বিক্ষোভকারীরা তাদের সমর্থন করে, তাদের লজ্জা পাওয়া উচিত।
অথচ দিনের পর দিন ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের প্রাণ ঝরছে তা নিয়ে তিনি তো কোনদিনই লজ্জা পাননি। তার কারণে গাজা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩৯ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এরপরই নির্লজ্জের মত সাহায্যের আশায় ইউরোপের দেশ আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হাত পেতেই যাচ্ছেন।
নেতানিয়াহু, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়ে যে তিনি প্রায়ই রিপাবলিকান এবং রক্ষণশীলদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নাক গলান, তার বক্তব্য শুরু করেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে প্রশংসা করে। কিন্তু তিনি এরপরই প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপর 'ইসরাইলের জন্য যতকিছু করার জন্য' প্রশংসার বন্যা বইয়ে দেন।
ইসরাইলি সময় সন্ধ্যায় দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু নিজ দেশের দর্শকদের কথাও মাথায় রেখেছিলেন। তার জনপ্রিয়তা যুদ্ধের আগের তুলনায় অনেক কমে গিয়েছে। আমেরিকা সফরে নিজের ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে সেই আশায় গুড়ে বালি। নিজে দেশেই ভাষণের সময় নেতানিয়াহুর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষও অনেক আগেই নেতানিয়াহুকে লার্ল কার্ড দেখিয়েছে। কারণ ইসরাইল এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকানরা এখন ক্রমশ বিভক্ত। গাজা যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। বুধবার কংগ্রেস ভবনের বাইরে নেতানিয়াহুর ভাষণের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়।
ক্যাপিটলের কাছে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করলে পুলিশ পেপার স্প্রে ব্যবহার করে। বিক্ষোভকারীরা নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে অভিহিত করে এবং গাজায় যুদ্ধ বিরতির আহবান জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু নেতানিয়াহুর সফরের সময় সাধারণত যে উষ্ণতা থাকে, এবার রাজনৈতিক ঘটনাবলীর কারণে অনেক কম, যার মধ্যে রয়েছে ট্রাম্পকে হত্যার প্রচেষ্টা এবং দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সরে দাঁড়াবার সিদ্ধান্ত।
টেম্পল মাউন্টে ইসরাইলিদের প্রার্থনার অনুমতি