গাজা উপত্যকাজুড়ে এখন শুধু মৃত্যু পর মৃত্যু, আর ধ্বংসলীলা। মানুষের গা শিউরে উঠলেও বিশ্বনেতাদের মুখে কুলুপ। যুদ্ধবিরতি নিয়ে চলছে টালবাহানা। ছয় মাস পার হওয়া যুদ্ধের বলি ত্রিশ হাজার পেরিয়ে গেছে বেশ আগেই, তারপরও ইসরাইলি হায়েনাদের আগ্রাসী মনোভাবে কমতি নেই কোন।
প্রতিনিয়ত হামলার পরিধি বাড়িয়েই চলেছে নেতানিয়াহুর লেলিয়ে দেয়া সেনারা। সামনেই রমজান। পবিত্র এই মাসে ইসরাইলের দোসর আমেরিকাও চাইছে শান্তি, কিন্তু কে শুনে কার কথা। ইসরাইল কী চায়, তা বোধহয় তারাও জানে না। গাজাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে বোধহয় থামবে না এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
মৃত্যু মিছিল, দুর্ভিক্ষ, চিকিৎসা ও ওষুধের অভাব কোনও কিছুই বোধহয় দাগ কাটছে না ইসরাইল সরকারের হৃদয়ে। শান্তি যেন সেখানে এক দূরতর দ্বীপ। যে কোনও মুহূর্তে ইসরাইলি গুলি ভেদ করে যাবে শরীর, বোমার টুকরো এসে ছিন্নভিন্ন করে দেবে হাত-পা-মাথা, তার জন্যই যেন দিন গুনছে গাজার মানুষ।

গাজার এমন কোনও জায়গা বেঁচে নেই, যেখানে গিয়ে মাথা লুকোতে পারে ফিলিস্তিনিরা। প্রতিদিন মারা যান হাজার হাজার মানুষ। নারী-শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ বাঁচতে পারছেন না ইসরাইলি হামলা থেকে। প্রতিদিন শতসহস্র মানুষের মৃতদেহ জমছে এদিকে ওদিকে। গণকবর রচিত হচ্ছে প্রতিদিন সমগ্র গাজাজুড়ে।
৬৪ বছরের সাদি হাসান সুলেমান বারাকা। স্থানীয় লোকেরা তাকে ডাকেন আবু জাওয়াদ নামে। তিনি গাজার মানুষের বেহেস্তে যাওয়ার দূত। তার হাতেই দাফন হয় এলাকার সব মৃত মানুষের। গত কয়েক দশক ধরে এটাই তার পেশায়। মৃতদেহ নিয়েই কাজ আবু জাওয়াদের। তবু এই মৃতদেহ যেন সে মৃতদেহ নয়।
এ মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। ঈশ্বরের মমের বিরুদ্ধ এই মৃত্যু, যা লিখে দেয় কোনও ইসরাইলি সেনা তার নিষ্ঠুর বন্দুক বা বোমা হাতে। এ সব কথাই দিনরাত ভাবতে থাকেন জাওয়াদ। ঘুম আসে না তার। গেলো সাতই অক্টোবর থেকেই তাই তিনি ভালো করে ঘুমাতেও পারেন না।

মধ্য গাজার শরণার্থী শিবিরের প্রথম বাসিন্দা জাওয়াদ। আগে স্ত্রী ও শতবর্ষী মায়ের সঙ্গে থাকতেন দেইর এল-বালাহ এলাকারই একটি ছোট্ট বাড়িতে। মৃত্যু নিয়েই তাঁর কাজ। অথচ এলাকায় কী দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন জাওয়াদ। সবাই ভালোবাসতেন হাসিখুশি সহজ সরল এই মানুষটিকে।
গেলো ছয় মাসেই তার ওজন কমে গেছে প্রায় ৩০ কেজি। শীর্ণ হতে এতো দেহ কবর দিয়েছেন তিনি, যে গুনে শেষ করতে পারবেন না। তার মধ্যে কেউ তার কাছের মানুষ, কেউ তার পড়শি। যে খুদে শিশুটিকে কালই খেলে বেড়াতে দেখেছেন, বোমায় ছিন্নভিন্ন সেই শিশু নিথর দেহ মাটির তলায় শুইয়ে দিতে হয়েছে।
গত ২৭ বছরে যে পরিমাণ শবদেহকে কবর দিয়েছেন জাওয়াদ, গত পাঁচ মাসে তার দশগুণ দেহ সৎকার করতে হয়েছে তাকে। গাজা এখন গণকবর। কোনও একটি বিশেষ জায়গা বা এলাকা নয়, গোটা গাজাই যেন এক সমাধিক্ষেত্র। একসঙ্গে তিরিশটি-চল্লিশটি করে দেহ কবর দিতে হয় জাফরকে।

হিসেব বলছে, গত ৭ অক্টোবর থেকে কমপক্ষে ১৭ হাজার দেহকে কবর দিয়েছেন তিনি। প্রতিদিন সমাধিক্ষেত্র ভরে ওঠে মৃতদেহের মিছিলে। প্রতিদিন স্বজনকে নিয়ে সেখানে হাজির হন মানুষ। কান্নার কলরোলে ভেসে যায় মাটি। ভোর থেকে সন্ধে, জাওয়াদ কবর খোঁড়েন। কফিন বানান, জানাজা প্রস্তুত করেন।
মৃত শরীরগুলোর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেন সজল হৃদয়ে। যুদ্ধে ছিন্নভিন্ন মনগুলো অন্তত এমন বেহেস্ত পাক, যেখানে যুদ্ধ শব্দটার অস্তিত্ব নেই। মনে মনে সেই ইচ্ছাটা খুব করে বলতে থাকেন জাফর। শোক পালনের উপাচার পেরিয়ে সেই প্রার্থনাটুকু মিশে যায় গাজার বারুদের গন্ধভরা বাতাসে।

জাফরের সারাদিনের কাজে সাহায্য করেন খান ইউনিসের চার যুবক। তারা বাস্তুচ্যুত হয় পথ হারিয়ে ফেলা সহযাত্রীদের মাটি জোগান। একই সঙ্গে যুদ্ধ বিধ্বস্ত গাজায় অভুক্ত মানুষদের সাহায্যের ব্যবস্থা করে দেন জাফর আর তার সঙ্গীরা। বিনিময়ে তারা কিছুই চান না, শুধু গাজায় একমুঠো শান্তি ছাড়া।
জাতিসংঘ নারী অধিকার কমিশন থেকে ইসরাইলের বহিষ্কার চায় ইরান