ইসরাইলি ভূখণ্ডে হামাসের অভাবনীয় হামলার প্রতিশোধ হিসাবে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা অবরুদ্ধ করে রেখে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করছে ইসরাইলের সেনারা। দেশটির নেতারা আগেই ঘোষণা দেন, তাদের বন্দিদের মুক্তি দেয়া না হলে গাজার বাসিন্দাদের পানিতে-ভাতে-কাপড়ে মারবে।
ইসরাইলের একের পর এক হামলায় গাজার কোথাও এখন নিরাপদ নয়। গোটা এলাকা অবরুদ্ধ করায় দেখা দিয়েছে খাবার, পানিসহ জ্বালানির চরম সংকট। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না পানি। এরইমধ্যে সেখানে থেকে প্রায় চার লাখের বেশি মানুষ বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
ইসরাইলের টানা হামলায় গাজা উপত্যকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। মুহুর্মুহু হামলায় কেঁপে উঠছে পুরো গাজা। ধসে পড়ছে একের পর এক স্থাপনা। দেখা দিয়েছে খাবারের চরম সংকট। অনেক জায়গায় নেই বিদ্যুৎ। সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন গাজাবাসী। অনেকে জীবন বাঁচাতে পরিবার নিয়ে নিরাপদ জায়গায় পালিয়েছেন। অনেকে আশ্রয় শিবিরে উঠেছেন। দেখা দিয়েছে চরম মানবিক সংকট।

পানির শূন্য ড্রামগুলো ভরতে এখন দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে গাজার বাসিন্দারা। ইসরাইল সেখানে খাদ্য জ্বালানিসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় সরবরাহ বন্ধ করায় তীব্র পানি সংকটে মানুষ। শুধু পানি নয়, বেঁচে থাকার সব অবলম্বন ও সহযোগিতা বন্ধ হওয়ায় গাঁজায় নেমে এসেছে চরম মানবিক বিপর্যয়।
এখানে জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম কিছুই অবশিষ্ট নেই। খাবার নেই, পানি নেই। শিশুদের খাওয়ানোর মতো দুধ নেই, পরনের কাপড় নেই। আসলে এটা কোনো জীবন নয়। জ্বালানি সংকটে চলছে না গাড়ি। তাই, পানি সরবরাহের জন্য এখন ঘোড়ার গাড়িই ভরসা। পানি সংগ্রহ করে দুর্গত মানুষের মাঝে বিতরণ করছে।
এক ফিলিস্তিনি নাগরিক বলেন, যাদের বাড়িঘর ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে এবং যারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে তাদের জন্য আমরা পানি পাঠাচ্ছি। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের কাছে পানি খাবার কিছুই নেই। তাদের আছে শুধু দুর্ভোগ, ভয় এবং আতঙ্ক। গাজায় দিনকে দিন মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে।
ইসরাইলের হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত গোটা এলাকা। স্যান্ডুইচের মতো লেপটে থাকা ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে শেষ সম্বলটুকু খোঁজার চেষ্টা করছেন বাসিন্দারা।

এরইমধ্যে প্রায় ২৩ হাজার বাড়িঘর গুড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইল। ধ্বংস হয়েছে ১০টি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র এবং ৪৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই পরিস্থিতিতে শেষ সম্বলটুকু সাথে নিয়ে যে, যেভাবে পারছে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন মানুষ। কারণ এই মুহূর্তে গাজার কোথাও এক মুহূর্তের জন্য নিরাপদ নয়।
শুক্রবার ওয়াদি এলাকার চার লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে এলাকা ত্যাগ করেছেন। শনিবারেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।সুস্পষ্ট নির্দেশনা বা নিরাপদ করিডর ছাড়াই মানুষ বাড়ি ঘর ছাড়ছে। কারণ গাজার কোথাও এখন নিরাপদ নয়। এটি আরও উদ্বেগের বিষয়, কারণ হামলা অব্যাহত থাকায় আরও ধ্বংসাত্মক পরিণতি হতে পারে সেখানে।
৩৬৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট গাজা উপত্যকায় বসবাস করেন ২৩ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি। তাদের মধ্যে ১১ লাখ গাজা উপত্যকার মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বসবাস করে ওয়াদিতে। ঘনবসতিপূর্ণ গাজায় হামলার প্রথম দিনই পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে ইসরাইল।
এতে উপত্যকাজুড়ে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। গাজার বাসিন্দাদের অধিকাংশই খাদ্য সংকটে আছে। পাচ্ছে না নিরাপদ সুপেয় পানি। বাধ্য হয়ে তারা কুয়ার পানি খাচ্ছে, যা নোনা এবং অনিরাপদ। এতে করে এখানে জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এরইমধ্যে দেখা দিয়েছে ত্রাণ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট। ত্রাণ কর্মীদের যা মজুদ আছে তা দিয়ে বড়জোর সপ্তাহখানেক চাহিদা মেটানো যাবে। এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সব সংকট ছাপিয়ে ইসরাইলের হামলায় নিহত গাজাবাসীর দাফন সম্পন্ন করছেন স্বজনেরা। প্রিয়জনদের শেষ বিদায়ে কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে গোটা এলাকা।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের হামলা মাত্র শুরু হয়েছে। টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তিনি আরও বলেন, আমরা হামাসকে ধ্বংস করে দেব। আমরা জয়ী হব, তবে এ জন্য কিছুটা সময় লাগতে পারে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে ইসরাইলি নেতা নেতানিয়াহু আরও বলেন, সবাই জানে আমরা জন্মভূমির জন্য সিংহের মতো লড়াই করছি। আমরা হামাসের হামলার ঘটনা কখনোই ভুলব না। আমরা তাদের ওপর এমন হামলা চালাবো, যা তারা কখনোই ভাবতে পারেনি।
ইসরাইলি হামলায় এক সপ্তাহেই ১১ সাংবাদিক নিহত
বিবিসি সাংবাদিকদের পেটালো ইসরাইলি পুলিশ
শক্তিশালী রাষ্ট্রে যেভাবে পরিণত হলো ইসরাইল