টানা ৪৮ দিন প্রাণভয়ে ছুটে চলার পর মিলেছে বিরতি। ঘরে ফেরার আকুল আবেদন চেপে রাখতে না পেরে বিধ্বস্ত নগরে ফিরতে শুরু করেছেন গাজার বাসিন্দারা। কিন্তু ইসরাইলি বাহিনীর বিমান হামলায় ইট সিমেন্টের গাথুনি পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তুপে। বসবাসযোগ্য নেই একটি ভবনও।
যুদ্ধবিরতির খবর শুনেই নিজ বাড়িতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন ৫৮ বছর বয়সী তাহানি আল নাজ্জার। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার খান ইউনিসের বাসিন্দা এই নারী পাঁচ সন্তানের মা। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন নিজ ঠিকানার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ফিরে এসে পরিচিত শহরের কোন অস্তিত্বই তিনি খুঁজে পান না। ভুতুড়ে এক নগরীতে পরিণত হয়েছে তার এলাকা। মাটির সাথে মিশে গেছে সাজানো সংসার।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, চুক্তির কথা শুনেই বাড়ি ফিরবো বলে ঠিক করি। কিন্তু এ কোথায় ফিরলাম। আর এখন যাবোই বা কোথায়? এমন জীবন আর কতো কাটাবো? এক জীবনে এ নিয়ে তিনবার ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় ধ্বংস হলো তার বাড়ি। আর এবারের নৃসংশতায় হারিয়েছেন পরিবারের সাত সদস্যও।

সেই কথা স্মরণ করে তাহানি বলেন, এটাতো এই প্রথম না। ২০০৮ আর ২০১৪ সালেও বোমায় আমার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কৃপায় বারবার নতুন করে ঘর বেধেছি আমরা।
জানা যায়, গাজার দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের মধ্যে এক ধরণের সামরিক সীমারেখা টেনে রেখেছে ইসরাইলি বাহিনী। ফলে উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা, যারা দক্ষিণে পালিয়ে গিয়েছিলো, যুদ্ধবিরতির এই সুযোগে তারা বাড়ি ফেরার চেষ্টা করায় পড়তে হয় ইহুদি বাহিনীর বাধার মুখে। এমনকি এ চেষ্টাতেও প্রাণ যায় কয়েক ফিলিস্তিনির।
যুদ্ধবিরতির এই সংক্ষিপ্ত সময়ে যতো বেশি সম্ভব গাজায় ত্রাণ পাঠাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। দীর্ঘদিন পর খাবার, পানিসহ মৌলিক চাহিদা মেটানোর সুযোগ পেয়ে কিছুটা স্বস্তিকর অবস্থা দেখা যায় উপত্যকাটিতে।
যুদ্ধবিরতির খবর পেয়ে সবাই অনেকটা স্বস্তি বোধ করছে। বহুদিন থেকে খাবার, পানি, বিদ্যুৎ ছাড়া যে অবস্থায় দিন কাটিয়েছে তারা, সেই পরিস্থিতি থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মিলেছে।

জ্বালানির অভাবে গাজায় কোনো যানবাহন চলছে না। তাই কয়েক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটেই পাড়ি দিচ্ছে এসব সাধারণ মানুষ। তবু মুখে লেগে আছে বিস্তৃত হাসি, চোখ জ্বলজ্বল করছে আনন্দে। এমনই অনিশ্চয়তা বুকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরা এক ফিলিস্তিনি বলেন, ভীষণ স্বস্তিবোধ করছি। বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। দীর্ঘ অত্যাচারের পর মনটা একটু বিশ্রাম পেয়েছে আমার। চারদিন পর যদিও আবার ফিরতে আসতে হবে। কিন্তু মন মানছে না। তাবুর অস্বস্তিকর নোংরা পরিবেশে আর ভালো লাগছে না। বাড়িতে গিয়ে এই চারদিন একটু স্বাভাবিক জীবনযাপন করবো।
অল্প সময়ের জন্য হলেও নিজ বাড়িতে স্বাভাবিক জীবন কাটাতে চান তারা। তবে, এই মানুষগুলোর জানা নেই তাদের ভিটে-মাটি আদৌও টিকে আছে কিনা। অন্যদিকে, উপত্যকার উত্তর দিকের বাসিন্দাদের বাড়ি ফিরতে একেবারেই নিষেধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে থাকা এ মানুষগুলো যারপরনাই নাখোশ এমন সিদ্ধান্তে।
জ্বালানি আর ত্রাণ সংগ্রহে সকাল থেকেই লম্বা লাইন পড়ে যায় গাজার শরণার্থী শিবিরগুলোতে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ অনেক কম হওয়ায় সবাইকে ত্রাণ দিতে হিমশিম খাচ্ছেন ত্রাণ বিতরণকারীরা। পাঁচশ' ট্রাক ত্রাণের চাহিদার বিপরিতে দৈনিক দুইশ' ট্রাক ত্রাণ ঢুকছে গাজায়। এ সংকট ঘোচাতে আরেকটি মানবিক করিডর প্রয়োজন বলে জানিয়েছে রেড ক্রিসেন্টের ফিলিস্তিন বিষয়ক সংস্থা।

উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর হামাসের অতর্কিত হামলার পর গোষ্ঠীটিকে নির্মূলে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা দেয় ইসরাইল। গাজায় উপত্যকায় নির্বিচার ও বিরামহীন বিমান হামলা শুরু হয়। সপ্তাহ খানেক পর শুরু করে স্থল অভিযান। ইসরাইলি বাহিনী যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সর্বাত্মক হামলা শুরু করেছিল, দেড় মাসেও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। হামাস ধ্বংস হয়নি বা গোষ্ঠীটিকে নির্মূল করতে পারেনি ইসরাইল। তারা তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং বীরের মতো লড়াই করেছে।
