‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ বা আল-আকসা তুফানের ‘মাস্টারমাইন্ড’ খ্যাত হামাসের সামরিক শাখা ইজাদ্দিন আল-কাসাম ব্রিগেডের প্রধান মোহাম্মদ দেইফকে হত্যা করা হয়েছে বলে দখলদার ইসরাইল সম্প্রতি যে দাবি করেছে তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে সংগঠনটি।
লেবাননে হামাসের প্রতিনিধি ও পলিট ব্যুরোর সদস্য ওসামা হামদান বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন।
হামদান বলেন, ইসরাইলি গণমাধ্যম ও সরকারি কর্মকর্তারা মোহাম্মদ দেইফকে হত্যা করার বিষয়ে যে দাবি করেছে তা মিথ্যা, বরং হামাসের সামরিক শাখার প্রধান কমান্ডার সুস্থ আছেন।
এর আগে গেলো ১ আগস্ট ইসরাইল দাবি করেছিলো যে, জুলাই মাসে এক বিমান হামলায় শীর্ষ হামাস কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফ নিহত হয়েছেন।
ওসামা হামদান বলেন, হামাস বিশ্বাস করে, জুলাই মাসে দেইফকে হত্যার লক্ষ্যে ইসরাইল ওই হামলা পরিচালনা করেছিলো। ওই হামলায় ৮৮ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হন।

এর আগে গেলো বছরের অক্টোবর মাসের ৭ তারিখে ইসরাইলে এই দশকের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান চালায় গাজার হামাস সরকার। এর পরপরই গাজায় বিমান হামলা ও স্থল হামলা শুরু করে ইসরাইল। এ আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। আহত লাখ ছাড়িয়েছে।
কে এই মোহাম্মদ দেইফ?
১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর, গাজার খান ইউনিস জেলায় গড়ে উঠে এক ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু শিবির। ১৯৬৫ সালে সেই উদ্বাস্তু শিবিরেই জন্ম হয়েছিলো দেইফের। তবে, বাবা-মা তার নাম দিয়েছিলেন মোহাম্মদ মাসরি। পরে তিনি দেইফ নামেই পরিচিতি পান।
১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদা বা ফিলিস্তিন বিদ্রোহের সময় তিনি হামাসে যোগ দেন। সেই সময় থেকেই তার নাম হয়, মোহাম্মদ দেইফ। ১৯৮৯ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে ইসরাইল। ১৬ মাস জেলে ছিলেন তিনি। পরে ফিলিস্তিনের মুক্তির আন্দোলনে যোগ দেয়ার পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান।
গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন মোহাম্মদ দেইফ। শিল্পকলার প্রতিও তার অনুরাগ ছিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদন কমিটির প্রধান ছিলেন। মঞ্চ নাটকে অভিনয়ও করতেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর পুরোপুরি হামাসের আন্দোলনে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন।
একেবারে নিচু স্তর থেকে পুরোপুরি নিজের দক্ষতা ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে হামাস গোষ্ঠীর বড় নেতা হয়ে ওঠেন দেইফ। ২০০২ সালে তিনি প্রথম আল কাসাম ব্রিগেডের প্রধান পদে বসেন। তারপর থেকে তিনি ওই পদেই আছেন। তার উদ্যোগেই টানেল নেটওয়ার্ক এবং বোমা তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে হামাস।
আত্মঘাতী বোমা হামলায় বেশ কয়েকজন ইসরাইলি নাগরিকের মৃত্যুর জন্য দেইফকে এককভাবে দায়ী করে আসছে ইসরাইল। গত কয়েক দশক ধরে ইসরাইলে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার শীর্ষে রয়েছে তার নাম। ইসরাইলি হামলায় তার একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন, যার জন্য তাকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হয়।
২০১৪ সালে ইসরাইলি বিমান হামলায় তার স্ত্রী, সাত মাস বয়সী এক ছেলে এবং তিন বছরের মেয়ের মৃত্যু হয়েছিলো। ২০২৩ একইভাবে মৃত্যু হয়েছে তার বাবা ও ভাইয়ের।
দেইফের বর্তমান হদিস কেউ জানে না। অনেকের অনুমান, মাটির নিচে কোনো সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধা তৈরি করে তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন। সেখান থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। ইসরাইল ও তার দোসরা দেইফকে যা কিছু আখ্যায়িত করুক না কেন তিনি ফিলিস্তিনের কাছে বীরের মর্যাদা পেয়ে থাকেন।
ফিলিস্তিনের লোকগাথায় ঢুকে পড়েছে দেইফের নাম। আজও ফিলিস্তিনি মায়েরা শিশু সন্তানকে দেইফের বীরোচিত গল্প শোনাতে ভালোবাসেন। গাজার অধিবাসীরা তাকে বলেন, তিনি অধরা। তিনি ছায়ামানব।
ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ না নিলে গজব পড়বে: খামেনি
গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু ফোনালাপ