হামাস-ইসরাইল যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ হুতি। হামাসের হামলার জবাবে তেল আবিব সব শক্তি নিয়ে গাজাবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র হিজবুল্লাহ গোষ্ঠির মতো ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিরাও ইসরাইলকে হুমকি দেয়।
এরপর হুতিরা হামাসের সমর্থনে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের ইসরাইলকে লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়। অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোমের মাধ্যমে ইসরাইল সেগুলো আকাশেই ধ্বংস করে দেয়ার পর হুতিদের 'গুরুত্বহীন' মনে করতে থাকে আন্তর্জাতিক মহল।
কিন্তু হঠাৎ করে দৃশ্যপট পাল্টে যায় ১৯ নভেম্বর লোহিত সাগরে হুতিদের হাতে জাহাজ আটকের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ ও ইসরাইলি মালিকানাধীন ও জাপান থেকে পরিচালিত 'গ্যালাক্সি লিডার' জব্দ ও এর ২৫ ক্রুকে জিম্মি করার পর হুতিরা রাতারাতি পরিণত হয় বিশ্বের সংবাদ শিরোনাম।
হুতিরা গোটা বিশ্বকে সতর্ক করে জানায়, গাজা উপত্যকায় খাদ্য ও ওষুধ ঢুকতে না দিলে ইসরাইলি বন্দরমুখী যে কোনো জাহাজে হামলা চালাবে তারা। এরপর একের পর এক জাহাজে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। অল্প সময়ের ব্যবধানেই লোহিত সাগরে পশ্চিমাদের শক্র ভয়ংকর হয়ে উঠে হুতি।
হুতিদের ইসরাইলমুখী জাহাজে হামলার কারণে বিপর্যয়ের মুখে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল। হুমকির মুখে পড়ে বিশ্ব বাণিজ্য। এরিমধ্যে বিশ্বের শীর্ষ জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো জানিয়ে দিয়েছে, তারা আর লোহিত সাগরে যাবেন না। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে হুতিরা ভারতগামী জাহাজে হামলা করার পর।
হুতিদের এমন কঠিন অবস্থানে বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছে ইসরাইলও। লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ যদি চলাচল না করে তাহলে সম্ভাব্য জ্বালানি ও খাদ্য সংকটে পড়তে নেতানিয়াহুর সরকার। যে সংকট কাটিয়ে ওঠার মতো অর্থও এখন দেশটির হাতে নেই। কারণ যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশটির ভান্ডারও ফতুর।
স্বয়ং ইসরাইলের সরকারি কর্মকর্তারা শাসকদের কাছে এমনই বার্তা পাঠিয়েছেন। লোহিত সাগরে বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে ইসরাইলে খাদ্য সংকটে পড়তে হবে এমন বার্তা দিয়ে, দেশটির নিজস্ব খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর তাগাদা দিয়েছে দেশটির খাদ্য কর্মকর্তারা।
তুর্কি বার্তা সংস্থা- আনাদোলুর এক খবরে বলা হয়েছে, গাজায় যুদ্ধ বিলম্বিত হওয়ায় লোহিত সাগরে ঝুঁকির মুখে পড়ছে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো। ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রফতানি। এ পরিস্থিতিতে ইসরাইলের খাদ্য খাত সংশ্লিষ্টরা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এতে খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে দেশটি।
গেলো সোমবার ইসরাইলি গণমাধ্যম মারিভ ডেইলির এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। খাদ্য উৎপাদনের হার যেন ৭৫ শতাংশের কম না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখার ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বলছেন, উৎপাদন ৭৫ শতাংশের কম হলে ভয়াবহ হুমকিতে পড়বে দেশ।
ইসরাইলের পণ্য পরিবহনে সবচেয়ে বড় রাস্তা হচ্ছে সমুদ্রপথ। হুতিরা লোহিত সাগরে ইসরাইলমুখী সব জাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়ার পর বহু কোম্পানি সেপথে আর যাচ্ছে না। ফলে লোহিত সাগর দিয়ে ইসরাইলে কোনও মালামাল বা জিনিসপত্র আসা এবং যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
আমেরিকা এই পথ খোলার জন্য বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে একটি জোট গড়তে চাইছে। কিন্তু মিত্ররা এখন একে একে কেটে পড়েছে। আরব দেশগুলো হুতিদের মিসাইলের ভয়ে এই জোটে অংশ নেয়া থেকে বিরত রয়েছে। ইসরাইলের আর একটি সমুদ্রপথ ছিল মালয়েশিয়া হয়ে মালাক্কা প্রণালী।
কিন্তু মালয়েশিয়াও দেশটির সমুদ্রপথ দিয়ে ইসরাইলি জাহাজের আনাগোনা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে। এছাড়া ঘুরপথে জাহাজ চলাচলের কারণে বেড়ে গেছে জ্বালানি ব্যয়। ফলে ইসরাইল এখন খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, বর্হিবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার সংকটে পড়েছে।
