হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার কোনো অজ্ঞাত স্থানে দীর্ঘসময় লুকিয়ে থাকার পরিবর্তে গাজার বিভিন্ন স্থানে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে দাবি করেছে ইসরাইল।
অতি সম্প্রতি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) হাতে ধরা পড়া থেকে অল্পের জন্য দুই দুইবার তিনি বেঁচে যান বলে ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে। ইসরাইলি বাহিনীর দাবি দক্ষিণ গাজার শহর খান ইউনিসের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে লুকিয়ে আছেন ইয়াহিয়া।
এ শহরে আইডিএফ হামাস গেরিলাদের বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন ধরে তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে তারা হামাসে বেশকিছু সুড়ঙ্গের সন্ধানও পেয়েছে। সেসব সুড়ঙ্গে তারা ইয়াহিয়াসহ অন্যান্য হামাস নেতাদের সন্ধানে অভিযানও চালিয়েছে।
কে এই হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার?
ইসরাইলি কর্মকর্তাদের কাছে গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের একজন নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার। তিনি ২০১৩ সাল থেকেই সংগঠনটির নীতিনির্ধারক বোর্ডের সদস্য। হামাসের সামরিক শাখা কাসেম ব্রিগেডের কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফ ও তার ডেপুটি মারওয়ান ইসার এবং সিনওয়ার ৭ অক্টোবরের হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলে ইসরাইলের বিশ্বাস। গাজায় হামাসকে চলমান যুদ্ধে নেতৃত্বও দিচ্ছেন তিনি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামাস নেতার বড় একটি লক্ষ্য রয়েছে। কেননা, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির অন্যান্য কর্মকর্তা তাদের পরিকল্পিত হত্যা তালিকায় সিনওয়ারের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। তাকে ‘মৃত্যুপথযাত্রী’ বলে অভিহিত করেছিলেন তারা।
আবু ইব্রাহিম নামেও পরিচিত সিনওয়ার। তাকে ঘিরে অগণিত গল্প রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় রহস্যময় এক খলনায়ক রূপে।
লে. কর্নেল রিচার্ড হেচ নামে এক ইসরাইলি সামরিক মুখপাত্র সিনওয়ারকে ‘শয়তানের প্রতিচ্ছবি’ বলে বর্ণনা করেছেন। সিনওয়ারের পরিকল্পিত হামলাকে ‘জঘন্যতম’ বলে বর্ণনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
ইয়াহিয়া সিনওয়ার ১৯৬২ সালে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেন। ইসরাইলের কারণে ১৯৪৮ সালের নাকবা বা বিপর্যয়ের সময় ওই শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তার পরিবার। এর আগে, পরিবারটি মাজদাল নামে একটি ফিলিস্তিনি গ্রামের বাসিন্দা ছিল, যেটি ইসরাইলি আশকেলন শহর তৈরির জন্য ধ্বংস করে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল।
চলমান যুদ্ধে ইয়াহিয়ার ভূমিকা
সশস্ত্র গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়াহ গাজায় বসবাস করেন না। তার অনুপস্থিতিতে গাজায় হামাসের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় ইয়াহিয়া ও বাকিদের তত্ত্বাবধানে। তাদের পরিকল্পনায় হামাসের যোদ্ধারা গাজার সঙ্গে ইসরাইলের সীমান্তে আধুনিক সব প্রযুক্তিকে ফাঁকি দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের দেশ ইসরাইলে হামলা চালায়। এতে রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন বিশ্বনেতারা।

তাদের হামলার এই পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি এতটাই গোপনে ও সতর্কতার সঙ্গে করা হয়েছিল যে হামলার আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে মোসাদ কোনো উড়ো খবর পর্যন্ত পায়নি। এ ঘটনার পর খ্যাতিমান এ সংস্থার কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন।
গত ৭ অক্টোবর ইসরাইলের অভ্যন্তরে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে এক হাজার ১৪০ ইসরাইলিকে হত্যা এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করেন তারা, যাদের মধ্যে ১০৫ জনকে ইতোমধ্যে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বা হামলায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।
বন্দিবিনিময়ে ভূমিকা
হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে জিম্মি ও বন্দিবিনিময় নিয়ে বর্তমান আলোচনায় ইয়াহিয়া সিনওয়ার মুখ্য ভূমিকা পালন করছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তবে অন্যান্য বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরাইলি ও মার্কিন কর্মকর্তারা মন থেকে শান্তি চাইছেন না। তাদের দাবি, সিনওয়ার ও হামাসকে নিহিলিস্টি বা ধ্বংসবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের হিংস্র ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করছে ইসরাইল ও পশ্চিমারা। হামাসের যেকোনো বৈধ রাজনৈতিক লক্ষ্যকে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছে- হোক তা রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি বা দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করার মতো বৈধ রাজনৈতিক লক্ষ্য।
বুধবার বন্দিবিনিময় ও গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ করা নিয়ে মিসরের গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে আলোচনার জন্য কাতারে বসবাসকারী হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহ মিসরে পৌঁছেছেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে। এদিকে এএফপি জানিয়েছে, বন্দিবিনিময় নিয়ে আলোচনার জন্য দ্বিতীয় দফায় মোসাদ প্রধানকে ইউরোপে পাঠিয়েছে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। গাজায় অবরুদ্ধ অবশিষ্ট ১২৯ জন জিম্মির পরিবারকে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘এটা আমাদের দায়িত্ব এবং আমি সকল বন্দিকে মুক্ত করে আনবো।’

কিন্তু তবুও...
কিন্তু তবুও থামছেনা গাজায় ইসরাইলি হামলা। আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, স্কুল, শরনার্থী শিবির সবকিছুকেই হামলার লক্ষ্যবস্তু করে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী। হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কোনো অগ্রগতি না থাকলেও ইতোমধ্যে ইসরাইলি আগ্রাসনে নিহত হয়েছেন ১৯ হাজার ৬৬৭ জন ফিলিস্তিনি, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন আরও ৫২ হাজার ৫৮৬ জন।
তথ্যসূত্র: মল্লিকা সোনি, হিন্দুস্তান টাইমস।
